অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি আয়োজন নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ২০২৬ সালের বইমেলা আয়োজন নিয়ে বর্তমানে বাংলা একাডেমি ও দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের মধ্যে চরম মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হলেও, দেশের প্রায় তিন শতাধিক সৃজনশীল প্রকাশক এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের দাবি, পবিত্র রমজান মাসের মধ্যে মেলা না করে তা ঈদুল ফিতরের পরবর্তী সময়ে আয়োজন করা হোক।
Table of Contents
প্রকাশকদের আপত্তির মূল কারণসমূহ
প্রকাশকদের সংগঠনগুলো বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে বর্তমান সিদ্ধান্তকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ ও ‘আত্মঘাতী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তির প্রধান ভিত্তি হলো মাহে রমজানের পবিত্রতা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক সমস্যাগুলো। প্রকাশকরা মনে করেন, সারা দিন রোজা রাখার পর তীব্র গরম ও যানজট ঠেলে পাঠকেরা মেলায় আসবেন না, ফলে মেলা প্রাঙ্গণ পাঠকশূন্য থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া মেলার স্টলগুলোতে কর্মরত কর্মীদের মানবিক দিকটিও তাঁরা সামনে এনেছেন। নিচে প্রকাশকদের আপত্তির প্রধান কারণগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
টেবিল: ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা আয়োজনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ
| চ্যালেঞ্জের বিষয় | প্রকাশকদের যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ |
| পাঠক সমাগম | রোজার ক্লান্তি ও যানজটের কারণে সাধারণ পাঠক ও পরিবারের উপস্থিতি ব্যাপক হ্রাসের আশঙ্কা। |
| ব্যবসায়িক ঝুঁকি | গত দেড় বছরের মন্দার পর পাঠকহীন মেলায় অংশ নিলে অবশিষ্ট পুঁজি হারানোর ভয়। |
| কর্মী ব্যবস্থাপনা | রোজা রেখে ইফতার ও তারাবির সময় স্টলে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত অমানবিক। |
| জাতীয় প্রেক্ষাপট | ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক জনজীবন ও উৎসবে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা। |
| প্রাকৃতিক দুর্যোগ | বাংলা একাডেমি বৃষ্টির ভয় দেখালেও প্রকাশকরা রমজানের নিশ্চিত ক্ষতির চেয়ে বৃষ্টির ঝুঁকি নেওয়াকেই শ্রেয় মনে করছেন। |
প্রকাশনা শিল্পের বর্তমান সংকট
দেশের প্রকাশনা শিল্প গত দুই বছর ধরে কাগজ ও কালির উচ্চমূল্যের কারণে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অমর একুশে বইমেলাই তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, করোনাকালে ২০২১ সালেও এপ্রিল মাসে বইমেলা আয়োজনের নজির রয়েছে। সুতরাং এবারও যদি এপ্রিল মাসে ঈদুল ফিতরের পর মেলা শুরু হয়, তবে পাঠক ও দর্শনার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মেলায় আসতে পারবেন। এতে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের যে মিলনমেলা হয়, তার সার্থকতা বজায় থাকবে।
বাংলা একাডেমির অবস্থান ও অচলাবস্থা
বাংলা একাডেমি ঐতিহ্যগতভাবে ফেব্রুয়ারিতেই মেলা আয়োজনে আগ্রহী। তাদের মতে, এপ্রিল মাসে কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে মেলার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে প্রকাশকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রমজানের মধ্যে ব্যবসায়িক ও মানবিক ঝুঁকি বিবেচনা করে তারা মেলায় অংশগ্রহণ করবেন না। যদি বাংলা একাডেমি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে, তবে দেশের বড় বড় প্রকাশনী ছাড়াই মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
উপসংহার ও দাবি
প্রকাশক সমাজের দাবি হলো, বইমেলা কোনো আমলাতান্ত্রিক রুটিন কাজ নয়, বরং এটি প্রাণের উৎসব। জনস্বার্থ ও প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল যেন এই দাবিটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। ঈদের পর মেলা আয়োজন করলে প্রকাশকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন এবং আয়োজনটি সফল করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
