রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা দম্পতিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার (তারিখ উল্লেখ না থাকায়) রাতের কোনো এক সময় উপজেলার রহিমাপুর চাকলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। রোববার সকালে তারাগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ছাইয়ুম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নিহতরা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় এবং তার স্ত্রী সুবনা রায়। যোগেশ চন্দ্র রায় শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধাই নন, তিনি রহিমাপুর বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক হিসেবেও এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যোগেশ চন্দ্র রায় ও সুবনা রায় দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে রহিমাপুর চাকলা গ্রামে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। তাদের দুই ছেলে রয়েছেন, যারা উভয়েই বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত। বড় ছেলে সুবেন চন্দ্র রায় জয়পুরহাট জেলায় সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ছোট ছেলে রাজেশ খান্না রায় ঢাকায় পুলিশে কর্মরত আছেন। ঘটনার সময় তাদের কেউই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা দীপক রায় জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবারের বাড়িতে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে আসছেন। রোববার সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি বাড়ির গেটের বাইরে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তার সন্দেহ হয়। পরে তিনি আশপাশের কয়েকজন গ্রামবাসীকে ডেকে আনেন। গেট বন্ধ থাকায় তারা মই ব্যবহার করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপরই তারা স্বামী-স্ত্রীর নিথর দেহ দেখতে পান এবং দ্রুত বিষয়টি পুলিশকে জানান।
খবর পেয়ে তারাগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পরে লাশ দুটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি। তবে পারিবারিক শত্রুতা, ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যা কিংবা পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ—সব দিক মাথায় রেখে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। ইউএনও বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের খবরে রহিমাপুর চাকলা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা জানান, যোগেশ চন্দ্র রায় ও সুবনা রায় ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও সজ্জন মানুষ। কারও সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ ছিল বলে জানা নেই। তাই এমন নৃশংস ঘটনার পেছনে কারা জড়িত থাকতে পারে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নিম্নে ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত তথ্য টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ঘটনা স্থান | রহিমাপুর চাকলা গ্রাম, তারাগঞ্জ, রংপুর |
| নিহত | যোগেশ চন্দ্র রায় ও সুবনা রায় |
| পরিচয় | বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তার স্ত্রী |
| যোগেশ চন্দ্র রায়ের পরিচিতি | সাবেক প্রধান শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় |
| সন্তানের তথ্য | দুই ছেলে, দুজনই পুলিশে কর্মরত |
| ঘটনার সময় | শনিবার রাত |
| তথ্য নিশ্চিতকারী | তারাগঞ্জ থানা পুলিশ |
| প্রশাসনের ভূমিকা | ইউএনও ঘটনাস্থল পরিদর্শন |
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষা ও আশপাশের মানুষের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্থানীয়রা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হয়ে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
