যে গান যুদ্ধ জিতিয়েছিল, সেই গানেই ফিরছে ইতিহাস!

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল শুধু একটি প্রচারমাধ্যম নয়; এটি ছিল সংগ্রামের হৃদস্পন্দন। সেই কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা গান, কবিতা ও বার্তা মুক্তিকামী মানুষের মনে সাহস, প্রত্যয় এবং বিজয়ের অটল বিশ্বাস জন্ম দিয়েছিল। বিজয়ের অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এবার সেই ইতিহাস নতুনভাবে ফিরে আসছে তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠে।

বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী আয়োজিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা পরিবেশন করবেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তরুণদের সামনে তুলে ধরা হবে একাত্তরের সেই দিনগুলো—যখন গান ছিল প্রতিবাদের ভাষা, আর সুর ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে অদৃশ্য অস্ত্র।

এই আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গানগুলোর পেছনের ইতিহাস তুলে ধরা। যেমন, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটির জন্মকথা আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য। বরেণ্য শিল্পী ও সুরকার আপেল মাহমুদ স্মৃতিচারণায় বলেছেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন ছিল শিল্পীদের একমাত্র আশ্রয়। দিন-রাত গান লেখা, সুর করা ও রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়েই চলত তাঁদের জীবন।

গোবিন্দ হালদারের লেখা এই গানটি হাতে পাওয়ার পর আপেল মাহমুদের মনে হয়েছিল, এটি শুধু গান নয়—এ যেন বারুদের মতো শক্তিশালী শব্দসমষ্টি। নারী, প্রকৃতি, শান্তি ও মানুষের কথা একসঙ্গে তুলে ধরে গানটি মুক্তিযুদ্ধের মানবিক দিককে সামনে এনেছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গানটির সুর করা হয় এবং জুন মাসেই এটি বেতারে প্রচারিত হয়। এরপর এটি হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রেরণার উৎস।

এবারের আয়োজন সেই ইতিহাস তরুণদের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে। শুধু গাওয়া নয়, আলোচনার মাধ্যমে জানানো হবে কীভাবে একটি গান যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস জুগিয়েছে, কীভাবে সুরের মাধ্যমে মানুষ মৃত্যুভয় ভুলে লড়াই চালিয়ে গেছে। আয়োজকদের মতে, এতে তরুণ প্রজন্ম বুঝতে পারবে স্বাধীনতা কোনো হঠাৎ পাওয়া বিষয় নয়; এটি অর্জিত হয়েছে ত্যাগ, রক্ত এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মাধ্যমে।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের আয়োজন বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক সময় বিমূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু গান সেই ইতিহাসকে অনুভূতির জায়গায় নিয়ে আসে, হৃদয়ে দাগ কাটে।

বিজয় দিবসে তরুণ কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান তাই শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়—এটি ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ, যেখানে একাত্তরের চেতনা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।