যুদ্ধসামগ্রী নয়, সহানুভূতি ও সমর্থন প্রত্যাশা ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিবৃতির সরাসরি সমালোচনা না করলেও আক্রান্ত রাষ্ট্র হিসেবে মুসলিম বিশ্ব থেকে স্পষ্ট সহানুভূতি ও রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাশা করেছে ইরান। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদী বলেছেন, তেহরান কোনো দেশের কাছে যুদ্ধের সরঞ্জাম বা সামরিক লজিস্টিক সহায়তা চায় না; বরং একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

বুধবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় ইরান ভয়াবহ মানবিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। শনিবার শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় নিহতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

হামলার পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে বলেও রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন। তার মতে, এটি আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার দুই দফায় বিবৃতি দিলেও প্রথম বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করা এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রসঙ্গ না তোলার বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একইভাবে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাছ থেকেও শক্ত অবস্থান আশা করে তেহরান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দূতাবাসে যোগাযোগ করে সমবেদনা জানিয়েছেন। তবে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের সংহতি প্রকাশ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যাকাণ্ড গোয়েন্দা ব্যর্থতার ফল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি নয়; বরং পরিকল্পিত ও কাপুরুষোচিত হামলা। তিনি জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কোনো বিশেষ বাঙ্কার বা গোপন আশ্রয়ে ছিলেন না; স্বাভাবিকভাবে নিজের দপ্তরে কাজ করার সময়ই হামলার লক্ষ্যবস্তু হন।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিলেও ইরান নতি স্বীকার করবে না। তার ভাষায়, আত্মসমর্পণের চেয়ে প্রতিরোধ করে শহীদ হওয়াকেই ইরানি জনগণ বেশি মর্যাদার বলে মনে করে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো রাষ্ট্র যেন তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহার করতে না দেয়। অন্যথায় আগ্রাসনের জবাবে ইরান প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হবে।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা চুক্তি থাকলেও সেগুলো সরাসরি যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। তবে বাইরের আক্রমণের মুখে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতভেদ অনেকটাই দূর হয়ে গেছে এবং জনগণ এখন রাষ্ট্রের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়তথ্য
হামলা শুরুশনিবার
অভিযুক্ত পক্ষযুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
নিহতের সংখ্যাএক হাজারের বেশি (প্রাথমিক হিসাব)
নিহতদের মধ্যেআয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও পরিবারের সদস্য
ইরানের প্রতিক্রিয়াক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পাল্টা হামলা
ইরানের প্রত্যাশামুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক সমর্থন ও নিন্দা

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।