আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের সংজ্ঞা পাল্টে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানে এআই-এর ব্যবহার যুদ্ধ পরিকল্পনা ও আক্রমণের গতিকে ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুততর করে তুলেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বা ‘ডিসিশন উইন্ডো’ এতটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে যে, মানুষ এখন কেবল যন্ত্রের দেওয়া প্রস্তাব অনুমোদনকারী হিসেবে কাজ করছে। এই নতুন ধারার যুদ্ধকৌশল যেমন নিখুঁত লক্ষ্যভেদে সহায়তা করছে, তেমনি মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ।
Table of Contents
‘কিল চেইন’ ও সিদ্ধান্তের সংকোচন (Decision Compression)
সামরিক পরিভাষায় কোনো লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে তাতে সফলভাবে হামলা চালানো পর্যন্ত প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কিল চেইন’। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই প্রক্রিয়ায় অ্যানথ্রোপিক-এর তৈরি এআই মডেল ‘ক্লড’ (Claude) ব্যবহার করছে। এই এআই ড্রোন ফুটেজ, টেলিযোগাযোগ নজরদারি এবং মানব গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দেয়।
আগে যেখানে একটি বড় ধরণের অভিযানের পরিকল্পনা করতে দিন বা সপ্তাহ পার হয়ে যেত, এখন এআই-এর সহায়তায় তা কয়েক মিনিটে সম্পন্ন হচ্ছে। গবেষকরা একে বলছেন ‘ডিসিশন কমপ্রেশন’। এর ফলে সামরিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় এআই-এর দেওয়া তথ্যের গভীরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, যা ‘কগনিটিভ অফ-লোডিং’-এর ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও হামলার পরিসংখ্যান
ইরানে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন এবং বেসরকারি যুদ্ধপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালানটির টেকনোলজিস (Palantir Technologies) একত্রে কাজ করছে। তাদের তৈরি মেশিন লার্নিং ব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র নির্বাচন এবং এমনকি হামলার আইনি ভিত্তিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করে।
ইরানে পরিচালিত অভিযানের প্রাথমিক ও প্রযুক্তিগত চিত্র:
| বিষয়ের ধরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রথম ১২ ঘণ্টার হামলা | প্রায় ৯০০টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু। |
| ব্যবহৃত প্রধান এআই মডেল | ক্লড (অ্যানথ্রোপিক), প্যালানটির সিস্টেম। |
| হামলার কেন্দ্রবিন্দু | দক্ষিণ ইরান এবং তেহরানের সামরিক স্থাপনা। |
| সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা | এআই-নির্ধারিত লক্ষ্যভেদে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রয়াণ। |
| বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য | দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে হামলায় ১৬৫ জনের মৃত্যু। |
মানবিক বিপর্যয় ও নৈতিক উদ্বেগ
এআই-চালিত যুদ্ধের ভয়াবহ রূপ দেখা গেছে দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায়। বিদ্যালয়ের পাশে একটি সামরিক ব্যারাক থাকায় এআই সেটিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হামলায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রযুক্তি নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক ডেভিড লেসলি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যখন যন্ত্রের হাতে চলে যায়, তখন এর পরিণতি থেকে মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা বা প্রাণহানির দায়বদ্ধতা নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরণের উদাসীনতা তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ভারসাম্য
ইরান ২০২৫ সালে তাদের নিজস্ব এআই কর্মসূচি শুরুর দাবি করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, অ্যানথ্রোপিক তাদের এআই মডেল সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি না দিলেও, বর্তমানে পেন্টাগনের সাথে চুক্তির আওতায় সীমিত আকারে এর ব্যবহার চলছে। ওপেনএআই-ও সামরিক প্রয়োজনে পেন্টাগনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সামরিক দক্ষতা ও তথ্য বিশ্লেষণের গতি বহুগুণ বাড়লেও, এটি যুদ্ধের মানবিক দিকগুলোকে আড়াল করে ফেলছে। ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল আমূল বদলে গেলেও, যন্ত্রের সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা বজায় রাখাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।
