চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতকে সামনে রেখে ইরান একটি সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক যুদ্ধপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)–সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এই পরিকল্পনায় পাঁচটি সুস্পষ্ট ধাপে যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। তেহরানের দাবি, এ কৌশল কেবল সামরিক সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে।
এই পরিকল্পনা প্রকাশের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই এমন যুদ্ধছক প্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সতর্ক থাকতে বলায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলাপের আগে শক্ত অবস্থান জানান দিতেই তেহরানের এমন পদক্ষেপ।
ইরানের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ শুরু হবে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায়। পারমাণবিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হানলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের চেয়ে নিজেদের আঘাত হানার সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ইরান ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও কমান্ড কাঠামোর বড় অংশ মাটির গভীরে শক্তিশালী বাংকারে স্থানান্তর করেছে বলে দাবি করা হয়।
দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধের পরিধি ইরানের সীমান্ত ছাড়িয়ে বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিকল্পনার পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সক্রিয় করে ইসরায়েল ও মার্কিন মিত্রদের ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টির কৌশল নেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপে সাইবার যুদ্ধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিদ্যুৎ গ্রিড, পরিবহন ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও মনোবল দুর্বল করাই এর মূল লক্ষ্য। ইরানের কৌশলবিদদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে সাইবার আঘাত অনেক সময় সরাসরি সামরিক হামলার চেয়েও কার্যকর হতে পারে।
চতুর্থ ধাপে সবচেয়ে স্পর্শকাতর পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরানের ধারণা, এই পথ অবরুদ্ধ করতে পারলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে।
পঞ্চম ও শেষ ধাপে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধ। ইরানের বিশ্বাস, ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর মার্কিন জনমত আর কোনো ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়। তাই যুদ্ধকে ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুললে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হবে।
নিচে ইরানের ঘোষিত পাঁচ ধাপের যুদ্ধপরিকল্পনার সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| ধাপ | প্রধান কৌশল | লক্ষ্য |
|---|---|---|
| প্রথম | গভীর বাংকারে সক্ষমতা সংরক্ষণ | পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি |
| দ্বিতীয় | আঞ্চলিক ঘাঁটি ও মিত্রদের সক্রিয়করণ | যুদ্ধ বিস্তার |
| তৃতীয় | সাইবার আক্রমণ | অবকাঠামো ও মনোবল দুর্বল করা |
| চতুর্থ | হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি | বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ |
| পঞ্চম | মনস্তাত্ত্বিক ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ | যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বাধ্য করা |
সব মিলিয়ে, এই পরিকল্পনা ইরানের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলেরও প্রতিফলন। যদিও বাস্তবে এমন সংঘাত শুরু হলে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।
