বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের চালানো হত্যাযজ্ঞকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবটি গত শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে উপস্থাপন করেন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীদের দায়ের বিষয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। পাশাপাশি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের—বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের—নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও উল্লেখযোগ্যভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরগুলোতে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তা প্রায় নয় মাস ধরে চলা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ বাঙালি জনগণ, নারী ও শিশু সহ সব ধর্মের মানুষের ওপর পরিচালিত হয়। প্রস্তাবে বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ল্যান্ডসম্যান প্রস্তাব উপস্থাপনকালে বলেন,
“পাকিস্তানি বাহিনীর ১৯৭১ সালের অভিযান জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যার মধ্যে পড়ে। এই স্বীকৃতি অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল।”
এর আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত একটি শুনানিতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এই শুনানির আয়োজন করে ‘হিন্দু অ্যাকশন’ নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা।
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জেলা নেতা দিলিপ নাথ জানান, ওই আলোচনার প্রেক্ষাপটেই প্রস্তাবটি কংগ্রেসে আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন,
“জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী আবার সক্রিয় হয়েছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের এলাকায় জামায়াত মানবতাবিরোধী কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রস্তাব পাস হলে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালের অপরাধের দায়ে জামায়াতকে আবারও নিষিদ্ধ করতে পারে।”
প্রস্তাবনার মূল বিষয়বস্তু
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রস্তাব উপস্থাপক | গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান, ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান |
| উদ্দেশ্য | ১৯৭১ সালের গণহত্যা স্বীকৃতি ও জামায়াতের বিচার |
| প্রধান দাবী | ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় নেওয়া |
| প্রেক্ষাপট | অপারেশন সার্চলাইট ও মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যাযজ্ঞ |
| অতীত উদ্যোগ | ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শোনা-ক্যাপিটল হিল শুনানি ‘হিন্দু অ্যাকশন’ আয়োজিত |
| সম্ভাব্য প্রভাব | ১৯৭১ সালের অপরাধে জামায়াতকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া |
প্রস্তাবনার মাধ্যমে কংগ্রেসের উদ্দেশ্য হলো ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষা করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রস্তাব পাস হলে এটি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি দেবে না, বরং মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বার্তা হিসেবেও কার্যকর হবে।
এই উদ্যোগকে বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইতিবাচক ধাপ হিসেবে দেখছেন, যা ইতিহাসের ন্যায্য স্বীকৃতি ও নৈতিক দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করবে।
