গত সপ্তাহান্তে তেহরানের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঘেরা হয়েছিল, যখন ইসরাইল তেলের মজুত রাখার ডিপোগুলোতে হামলা চালায়। বিস্ফোরণের ফলে রাস্তাঘাট আগুনে জ্বলতে থাকে এবং বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা লাখ লাখ নাগরিকের শ্বাসনালী ও ফুসফুসে প্রবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্বাস্থ্যঝুঁকি, শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, ক্যান্সার এবং অকালমৃত্যুর মতো ভয়াবহ ফলাফল দিতে পারে।
অভিযানটি শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে, যা ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড ও বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে সূচিত হয়। ওই হামলায় ১৬৫ স্কুলছাত্রী নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এ ধরনের নৃশংসতা নতুন নয়; ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বেসামরিকদের ওপর বিমান হামলায় শতাধিক শিশু ও পরিবার নিহত হয়েছিল।
ইসরাইলও দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে বেসামরিক এলাকা লক্ষ্যবস্তু করেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ৮৬ শিশুসহ প্রায় ৬০০ জন নিহত হয়েছে এবং ৭ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে তারা দিনের পর দিন ধ্বংস ও মৃত্যু ছড়িয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতে, ভেনেজুয়েলা ও ইরান বিশ্বের তেলের মোট মজুতের ৩১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই নিয়ন্ত্রণের অংশীদার হতে চায়। এর উদ্দেশ্য চীনের প্রভাব সীমিত করা ও মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করা।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| দেশ/শহর | বেসামরিক ক্ষতি | নিহত (শিশু) | উচ্ছেদকৃত মানুষ | প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| তেহরান, ইরান | অজানা | অজানা | লক্ষাধিক | বিষাক্ত ধোঁয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি |
| দক্ষিণ লেবানন | প্রায় ৬০০ | ৮৬ | ৭ লাখ | আবাসন ধ্বংস, উদ্বাস্তু |
| গাজা | অজানা | অজানা | অজানা | চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট |
বিশ্বরাজনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাব বড়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া, তেলের বাজারে আঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। কিছু বিশ্লেষক এটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরান জানিয়েছে তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত রসদ ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, যুদ্ধের সমাপ্তি কখনো সহজ হয় না; যেমন ২০০৩ সালে ইরাক বা ২০১১ সালে লিবিয়ায় দীর্ঘ লড়াই চলেছিল।
রাজনৈতিক এবং সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত শুধু যুদ্ধ নয়, এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক শক্তি খেলার অংশ। ইরানের নেতৃত্ব সংঘাত এড়ানোর চেয়ে তাদের অবস্থান দৃঢ় করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
এইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করেছে, যেখানে মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ একত্র হয়ে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।
