যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আবারও বড় পরিবর্তন এসেছে। শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং নির্দিষ্ট কিছু মানবিক সুরক্ষা পাওয়া বিদেশিদের দেওয়া কর্মসংস্থান অনুমতিপত্র—ইএডির মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে দেশটি। আগে এই ‘ওয়ার্ক পারমিট’ পাঁচ বছর মেয়াদি ছিল, কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি ১৮ মাস পরপর তা নবায়ন করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করেছে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মোট ১৯টি বিভাগের বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে এই নতুন মেয়াদ প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে: শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, ‘রিমুভাল অর্ডার’ থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা পাওয়া ব্যক্তিরা, টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস)–ধারীরা, মানবিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আরও কয়েক শ্রেণির অভিবাসী।
নতুন নিয়মের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসরত অনেক বিদেশির ওপর প্রশাসনিক চাপ আরও বাড়বে। আগে পাঁচ বছর অন্তর নবায়ন হওয়ায় প্রক্রিয়াগত সুবিধা ছিল, কিন্তু এখন প্রতি দেড় বছর অন্তর নতুন আবেদনের প্রয়োজন পড়বে, যা সময়, অর্থ ও আইনি প্রস্তুতির বাড়তি চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে, যারা ইতিমধ্যেই অনিশ্চিত জীবনে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতির ধারাবাহিকতা
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নিয়ে অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্বাহী আদেশ জারি করে অভিবাসন আইন আরও কঠোর করেন। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান শুরু হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে শুধু অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোরতা নয়, বৈধ প্রক্রিয়াতেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এর উদাহরণ হলো এইচ–১বি ভিসার ফি বৃদ্ধি—যা একসময় ছিল মাত্র ১,৫০০ ডলার, আর নতুন নীতিতে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ডলার। এই ভিসা মূলত বহুজাতিক কোম্পানির বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রযুক্তি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত হয়।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতা
সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আফগান শরণার্থীর গুলিতে দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বড় রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি হয়। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে আফগানিস্তানসহ ১৯টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তালিকায় রয়েছে মিয়ানমার, ইরান, লিবিয়া, ইয়েমেনসহ সন্ত্রাস ও সংঘাত–প্রবণ বেশ কয়েকটি দেশ।
এদিকে মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিকদের ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার, মানবিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচনা ও সম্ভাব্য প্রভাব
মানবাধিকার সংস্থা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ কমিয়ে দেওয়ার ফলে বাস্তবে লাখো শরণার্থী ও বৈধ অভিবাসীর জীবনজীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। নবায়ন বিলম্ব হলে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বন্ধ হওয়া, এমনকি বহিষ্কারের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং মানবিক সহায়তার ইতিহাসকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের ঘাটতি তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
