২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির জয়জয়কার চললেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানে এর বিরূপ প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি এবং ম্যাশেবলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছেন যার সরাসরি কারণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিস্টমাস’-এর তথ্যমতে, কোম্পানিগুলো এখন মানুষের শ্রমের চেয়ে এআই চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করাকে বেশি লাভজনক মনে করছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ১.১৭ মিলিয়ন মানুষ ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন, যা ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারির পর শ্রমবাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে এসে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল নভেম্বর মাসেই ৭১ হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ বা ৬ হাজার মানুষের চাকরি চলে গেছে সরাসরি এআই-এর কারণে। আমাজন ও ওয়ালমার্টের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় কমাতে এবং দক্ষতা বাড়াতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ কর্মীরা, যাদের কাজ এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্কিন শ্রমবাজারের অস্থিরতা ও এআই-এর প্রভাব নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এআই ও কর্মসংস্থান হ্রাসের চিত্র
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাবলি | বিশেষ মন্তব্য |
| এআই-এর কারণে ছাঁটাই | ৫৫,০০০ জন | প্রযুক্তির প্রভাবে হারানো কর্মসংস্থান। |
| বছরের মোট চাকরিচ্যুতি | ১.১৭ মিলিয়ন (১১.৭ লাখ) | ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। |
| নভেম্বরের ছাঁটাই চিত্র | ৭১,০০০ (এআই দায়ী ৯%) | শেষ প্রান্তিকে ছাঁটাইয়ের হার বৃদ্ধি। |
| ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ প্রতিষ্ঠান | আমাজন, ওয়ালমার্ট, গুগল | কাস্টমার সার্ভিস ও লজিস্টিক খাতে প্রভাব বেশি। |
| নিয়োগ পরিস্থিতি | ব্যাপকভাবে ‘হায়ারিং ফ্রিজ’ | নতুন কর্মী নিয়োগে অনাগ্রহ। |
| প্রভাবিত শ্রেণী | তরুণ ও নতুন গ্র্যাজুয়েট | এন্ট্রি-লেভেল চাকরিতে ধস। |
অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই-এর এই প্রভাব কেবল বর্তমান কর্মীদেরই ছাঁটাই করছে না, বরং নতুনদের জন্য শ্রমবাজারের প্রবেশদ্বারও বন্ধ করে দিচ্ছে। ওলফ রিসার্চের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্টেফানি রথ জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো এখন জুনিয়র কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জামগুলোকে কাজে লাগাতে বেশি আগ্রহী। একে প্রযুক্তিগত পরিভাষায় ‘হায়ারিং ফ্রিজ’ বলা হচ্ছে। এর ফলে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, কারণ এন্ট্রি-লেভেলের সাধারণ কাজগুলো এখন এআই টুলস দিয়েই অনায়াসেই করা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আগ্রাসন কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং এটি কর্মক্ষেত্রের চিরস্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কোম্পানিগুলো এখন এমন কর্মী খুঁজছে যারা এআই চালনা করতে জানে বা যারা জটিল সৃজনশীল কাজে দক্ষ। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সাথে যারা দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না, তাদের জন্য আগামীর দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষতাকে নতুন করে সাজানো এবং প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
