যুক্তরাষ্ট্রের দুর্যোগে বিমা শিল্পে চাপ

বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বিমা ক্ষতি আবারও ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক বিমা শিল্পের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত। সুইস রি প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, টানা ষষ্ঠ বছরের মতো এই বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে বিশ্বব্যাপী বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এখন আর বিরল ঘটনা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য স্থায়ী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরে ক্ষতির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যা প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

সুইস রির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট বিমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবে এই অঙ্ক প্রায় ১৬১ বিলিয়ন ডলারের সমান। যদিও এটি ২০২৪ সালের রেকর্ড ১৪১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কম, তবু গত দশ বছরের গড়ের কাছাকাছি থাকায় ঝুঁকির মাত্রা এখনও উচ্চ। সুইস রি বলেছে, সাময়িকভাবে ক্ষতির অঙ্ক কিছুটা কমলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকির ভিত্তি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

চলতি বছরে মোট বিমা ক্ষতির প্রায় ৮৩ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার। বছরের প্রথমার্ধজুড়ে দেশটিতে প্রবল বজ্রঝড় ও ভয়াবহ দাবানল ব্যাপক ক্ষতি ডেকে এনেছে। বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকায় সংঘটিত দাবানল বিমা খাতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সাল ইতোমধ্যেই বিমাকৃত দাবানল ক্ষতির ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়েছে, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দাবানলের তীব্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধি এ ক্ষতির অন্যতম কারণ।

প্রবল বজ্রঝড় বা কনভেকটিভ স্টর্মও বিমা শিল্পের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। টানা তৃতীয় বছরের মতো এই ধরনের ঝড় থেকে বৈশ্বিক বিমা ক্ষতি ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। সুইস রির দুর্যোগ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান বালৎস গ্রোলিমুন্ড বলেছেন, নগর সম্প্রসারণ, নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি এবং পুরোনো অবকাঠামো এসব ঝড়কে বিমা শিল্পের মূল ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। এককভাবে ছোট মনে হলেও ধারাবাহিক এসব ঝড় সম্মিলিতভাবে বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ক্যারিবীয় অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। অক্টোবরে জ্যামাইকায় আঘাত হানা হারিকেন মেলিসায় আনুমানিক ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে আটলান্টিক হারিকেন মৌসুম তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় হারিকেন আঘাত হানেনি, যা ক্ষতির অঙ্ক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার। এটি গত বছরের ৩২৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক কম এবং দশ বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ নিচে। তবে সুইস রি সতর্ক করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং সম্পদের ক্রমবর্ধমান ঘনত্বের কারণে ভবিষ্যতেও বড় অঙ্কের দুর্যোগজনিত ক্ষতি বৈশ্বিক বিমা শিল্পের বাস্তবতা থাকতেই থাকবে।