যশোরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের আধিপত্য: বাড়ছে সহিংসতা ও উদ্বেগ

নিচে আপনার দেওয়া সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত এবং মার্জিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো।

যশোরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের আধিপত্য: বাড়ছে সহিংসতা ও উদ্বেগ

সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে গত চার বছরে অপরাধের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। পুলিশি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত চার বছরে এই জেলায় ২৪৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৩ জনই প্রাণ হারিয়েছেন সরাসরি গুলিতে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ও সাধারণ মহলে এই অস্ত্র সংস্কৃতির বিস্তার নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।

চার বছরের অপরাধ চিত্র ও অস্ত্রের পরিসংখ্যান

যশোরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কারণগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পারিবারিক কলহ, যার পরেই স্থান করে নিয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। গত এক বছরে পুলিশি অভিযানে ১৯টি বিদেশি পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হলেও, তা মোট অবৈধ অস্ত্রের তুলনায় নগণ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভারত সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে আসা ৭.৬৫ মিলিমিটার বোরের পিস্তলের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

নিচে গত কয়েক বছরের হত্যাকাণ্ড ও উদ্ধারকৃত অস্ত্রের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সারণি: যশোরে গত চার বছরের হত্যাকাণ্ড ও অস্ত্র ব্যবহারের পরিসংখ্যান

সালমোট হত্যাকাণ্ডগুলিতে নিহতউল্লেখযোগ্য ঘটনা/কারণ
২০২২৫৫০২আধিপত্য বিস্তার ও লিঙ্গবৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব
২০২৩৪২০২ব্যবসায়িক বিরোধ ও রাজনৈতিক শত্রুতা
২০২৪৮৩০৪সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড, মাদক ও গ্যাং কালচার
২০২৫৬০০৩পারিবারিক কলহ (১২ জন) ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ
২০২৬ (জানুয়ারি)০৩০২নির্বাচনের আগাম ডামাডোলে রাজনৈতিক সহিংসতা

আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা ও সীমান্ত সংযোগ

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে ৭.৬৫ মিলিমিটারের পিস্তল। উদ্ধারকৃত পিস্তলগুলোর গায়ে ‘মেইড ইন ইতালি’ বা ‘ইউএসএ’ লেখা থাকলেও পুলিশের ধারণা, এগুলো মূলত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সীমান্ত এলাকায় তৈরি নকল পিস্তল। ভারত সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র সহজেই যশোরসহ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। গত এক বছরে ১৩টি অভিযানে ১৯টি বিদেশি পিস্তল ছাড়াও ২৯০টি গুলি, কার্তুজ এবং পাইপগান জব্দ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক উদ্বেগ ও নির্বাচনের প্রভাব

সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় প্রার্থীরা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অভিযোগ করেছেন যে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কোভিদ জাহিদ মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ধীরগতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

তবে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে পলাতক। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নির্বাচনের সময় কোনো ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সক্ষমতা সন্ত্রাসীদের নেই।

জননিরাপত্তা ও প্রতিকারের উপায়

যশোর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মতে, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। সীমান্তের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। অপরাধের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর নিহত ৬০ জনের মধ্যে ১২ জন পারিবারিক কলহে এবং ৭ জন আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে প্রাণ হারিয়েছেন। এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে জনসচেতনতা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

যশোরের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করে সাড়াঁশি অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে আসন্ন নির্বাচন এবং সামাজিক শান্তি—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে পড়বে।