মোহাম্মদপুরে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ দ্বন্দ্বে গ্যাং সহিংসতা নিহত ইমন

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ফুটপাতের চাঁদা আদায় ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের জেরে কিশোর গ্যাংয়ের কথিত নেতা ইমন হোসেন ওরফে ‘এলেক্স ইমন’ নির্মমভাবে খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর–বছিলা সড়কের ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের বিরোধই শেষ পর্যন্ত এই রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনাটিকে ‘আধিপত্য বিস্তার’ কেন্দ্রিক সংঘর্ষ হিসেবে উল্লেখ করলেও সরাসরি চাঁদাবাজির বিষয়টি তারা নিশ্চিতভাবে স্বীকার করেনি।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহত ইমনের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও সহিংস অপরাধের মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।


ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দীর্ঘদিনের সংঘাত

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে বেড়িবাঁধ তিনরাস্তার মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কের ফুটপাত দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ চাঁদা আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। প্রায় তিন শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন আদায় হতো প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা, যা মাস শেষে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাত বলে স্থানীয়রা জানান। এই বিপুল অর্থের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাইল্লা বাদল গ্রুপ এবং ইমন গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ চলছিল।


হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, গত রোববার দুপুরের পর রায়েরবাজারের পাবনা গলি এলাকায় ইমন গ্রুপ প্রথমে কাইল্লা বাদল গ্রুপের ওপর হামলা চালায়। এতে প্রতিপক্ষ গ্রুপটি সেখান থেকে পিছু হটে।

প্রায় এক ঘণ্টা পর আরমান ওরফে শাহরুখ, কাল্লু, ইয়াসিন, চিকু শাকিল, পেটকা তুহিন, ভান্ডারী ইমন, নেকেট শাকিলসহ অন্তত ১৫ জনের একটি দল পুনরায় সংগঠিত হয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। এরপর তারা ইমনকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আক্রমণ চালায়।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হামলার তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘটনাস্থলেই ইমনের শরীরের গুরুতর অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান।


গ্রেপ্তার ও উদ্ধার সামগ্রী

ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাইফ, তুহিন ও রাব্বি কাজীকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আরও একজন সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

নিচে উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
গ্রেপ্তারকৃত মোট সংখ্যা৪ জন
উদ্ধারকৃত চাপাতি৩টি
কাটার১টি
স্টিলের পাত১টি
মামলার ধরণআধিপত্য বিস্তার ও সংঘর্ষ

পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিরা চিহ্নিত অপরাধী চক্রের সক্রিয় সদস্য।


নিহত ইমনের অপরাধমূলক প্রেক্ষাপট

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৮টি মামলা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় তার প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন গ্যাংয়ের সঙ্গে বিরোধ চলছিল।


স্থানীয়দের আতঙ্ক ও প্রতিক্রিয়া

একজন স্থানীয় দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে একটি পক্ষই চাঁদা তুলত। তবে গত কয়েক মাস ধরে দুটি গ্রুপ আলাদা হয়ে একই দোকানে আলাদা আলাদা চাঁদা দাবি করায় ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কে ছিলেন।

তিনি বলেন, “একদিন একই দোকানে দুই পক্ষ এসে আলাদা নামে টাকা চাইত। তখনই বোঝা যাচ্ছিল বড় সংঘর্ষ হবে।”


পুলিশের বক্তব্য

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ফুটপাতের চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এমন নির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে তদন্ত চলছে।

অন্যদিকে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা জানান, এটি মূলত দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

তিনি বলেন, “এ ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকি আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”


মামলার অগ্রগতি

নিহত ইমনের মা ফেরদৌসী ২১ জনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।