মোহাম্মদপুরে ছাত্রদল নেতার গলায় ফাঁস: রহস্য ঘনীভূত

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় ছাত্রদলের এক শীর্ষস্থানীয় নেতার রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। গত ১১ নভেম্বর, মঙ্গলবার দুপুরে নিজ কক্ষ থেকে সাব্বির হাসান (২৫) নামের ওই নেতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাটি কেবল একটি অপমৃত্যু হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পুলিশি প্রাথমিক ধারণা এবং নিহতের রাজনৈতিক সহকর্মীদের দাবির মধ্যে ব্যাপক বৈপরীত্য থাকায় বিষয়টি এখন এক গভীর রহস্যের আবর্তে নিমজ্জিত।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মরদেহ উদ্ধার

নিহত সাব্বির হাসান মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের একটি বাসায় আরও তিন-চারজন সহকর্মীর সঙ্গে সাবলেট হিসেবে থাকতেন। ঘটনার দিন সকালে তাঁর অন্য রুমমেটরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বেরিয়ে যান। দুপুর দেড়টার দিকে ওই বাসার কক্ষের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকা অবস্থায় তাঁকে পাওয়া যায়।

বাসার অন্য সদস্যদের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার সকালে সাব্বির তাঁর এক সহকর্মীকে ফোন করে বাইরে থেকে নাস্তা নিয়ে আসার অনুরোধ জানান। নাস্তা নিয়ে ওই সহকর্মী যখন বাসায় ফেরেন, তখন সাব্বিরের কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি ও দরজায় আঘাত করার পরও কোনো সাড়া না মেলায় সহকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন, সাব্বির গলায় রশি প্যাঁচানো অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান যে, ঘটনার খবর পাওয়ার পর পরই পুলিশের একটি বিশেষ দল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা হতে পারে। ওসির মতে, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে সাব্বির সিলিংয়ের সাথে রশি দিয়ে ফাঁস দিয়েছিলেন। তবে সম্ভবত ঝুলে থাকার এক পর্যায়ে রশিটি ছিঁড়ে যায় অথবা গিঁট খুলে গিয়ে তিনি নিচে পড়ে যান।”

ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ রশি ও অন্যান্য কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে যা বর্তমানে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে মৃত্যুর কারণ বলা সম্ভব নয়। বর্তমানে এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

সহকর্মীদের বিস্ফোরক দাবি ও খুনের অভিযোগ

পুলিশের এই ‘আত্মহত্যা’র তত্ত্বকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাংবাদিকদের সামনে এক বিস্ফোরক দাবি তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা সাব্বিরকে যখন দেখি, তখন তাঁর হাত ও পা রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিল। কোনো মানুষ নিজের হাত-পা বেঁধে আত্মহত্যা করতে পারে না। এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সাব্বিরের রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে কোনো প্রভাবশালী পক্ষ তাঁকে হত্যার পর বিষয়টিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি একনজরে

উক্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রধান দিকগুলো নিচে সারণি আকারে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
নিহতের নামসাব্বির হাসান।
রাজনৈতিক পরিচয়যুগ্ম আহ্বায়ক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদল।
ঘটনার স্থানচন্দ্রিমা হাউজিং, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
তারিখ ও সময়১১ নভেম্বর ২০২৫, বেলা আনুমানিক ১:৩০ মিনিট।
মরদেহের অবস্থাগলায় রশি প্যাঁচানো, মেঝেতে শায়িত।
পুলিশের বক্তব্যপ্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা (রশি ছিঁড়ে নিচে পড়া)।
সহকর্মীদের অভিযোগহাত-পা বাঁধা ছিল, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
বর্তমান অবস্থাময়নাতদন্তের অপেক্ষায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে।

রহস্যের দানা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

সাব্বিরের এই মৃত্যুকে ঘিরে বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যা সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রথমত, যদি এটি আত্মহত্যাই হয়, তবে আত্মহত্যার ঠিক আগে তিনি কেন সহকর্মীকে নাস্তা নিয়ে আসতে বললেন? দ্বিতীয়ত, সহকর্মীদের দাবি অনুযায়ী যদি তাঁর হাত-পা সত্যিই বাঁধা থাকে, তবে পুলিশ কেন সেটিকে আত্মহত্যার তকমা দিচ্ছে?

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাসার সিসিটিভি ফুটেজ এবং সাব্বিরের মোবাইল ফোনের কল লিস্ট (CDR) যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার আগে তাঁর সাথে কার কার কথা হয়েছিল এবং নাস্তা আনার অনুরোধটি তিনি কাকে করেছিলেন—তা খতিয়ে দেখলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব। এছাড়া, ঘরটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল কি না এবং অন্য কোনো দিক দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ আছে কি না, তাও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করছেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জনমনে প্রভাব

মোহাম্মদপুরের মতো একটি ব্যস্ত এলাকায় দিনের আলোতে একজন ছাত্রদল নেতার এমন রহস্যজনক মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। মহানগর ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা না হয়, তবে তারা রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সামনে মঙ্গলবার বিকেল থেকেই নিহতের পরিবার ও শত শত ছাত্রদল নেতাকর্মীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তাঁদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাব্বির খুবই ধৈর্যশীল ছিলেন এবং তাঁর কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কলহ ছিল না। ফলে আত্মহত্যার বিষয়টি তাঁরাও সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না।

পরিশেষে বলা যায়, সাব্বির হাসানের এই মৃত্যু আমাদের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এটি যদি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, যদি এটি আত্মহত্যাও হয়, তবে কোন চাপ বা বিষণ্নতা তাঁকে এই পথে ধাবিত করল, তা উদ্ঘাটন করা জরুরি। একটি সুষ্ঠু