মোংলা বন্দরে লাইটার জাহাজ জ্বালানি সংকটে স্থবির কার্যক্রম

মোংলা বন্দরে জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতির কারণে পণ্য খালাস এবং নৌপরিবহন কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ লাইটার জাহাজ তেলের অভাবে খালি বসে থাকা এবং মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় বন্দরের কার্যক্রমে তীব্র অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে বিপাকে পড়েছেন।

লাইটার জাহাজের স্থবির অবস্থা

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে যাচ্ছে। বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হচ্ছে। বিশেষত খাদ্যশস্য, সার এবং শিল্প কাঁচামাল খালাস ও পরিবহনে চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, শতাধিক খালি লাইটার জাহাজ কয়েক দিন ধরে নোঙর করে অপেক্ষা করছে। একই অবস্থা খুলনার রূপসা নদীর ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকায়ও বিরাজ করছে। এমভি আর রশিদ-১ লাইটারের মাস্টার মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম জানান, জ্বালানি তেল না পাওয়ায় তারা পণ্যবোঝাই করতে যেতে পারেননি। তাঁরা লাইটারটি এক সপ্তাহ ধরে খালি রেখেছেন।

ব্যবসায়িক ও উৎপাদন প্রভাব

রূপসা এলাকায় অবস্থানরত সেভেন সার্কেল সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা মো. মামুন জানিয়েছেন, মোংলা বন্দরে কাঁচামাল আনা নির্দিষ্ট সময়ে খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন বাণিজ্যিক জাহাজকে ১৭,০০০ ডলার বিলম্ব মাশুল দিতে হচ্ছে। এছাড়া সিমেন্ট কারখানায় কাঁচামালের অভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, লাইটার জাহাজ সংকটে উৎপাদিত সিমেন্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না, যা সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

লাইটার মালিক ও এজেন্টদের বক্তব্য

  • মো. খোকন, এমভি মমতাজ লাইটারের মালিক: “মোংলা বাজারের তেল ব্যবসায়ী এসকে এন্টারপ্রাইজকে জানিয়েছি, কিন্তু ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল আসছে না। তাই লাইটার জাহাজ পণ্যবোঝাই করতে যেতে পারছে না।”
  • এইচ এম দুলাল, মেঘনা অয়েল কোম্পানির মেরিন ডিলার ও এজেন্ট: “সরকারি খাল খনন, নদী খনন ও আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি কার্যক্রমে তেলের চাহিদা বেড়েছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্য আহরণ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
  • প্রবীর হীরা, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (অপারেশন): “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে যুদ্ধের প্রভাব এবং কম প্রাপ্যতার কারণে সীমিত সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।”

লাইটার জাহাজ সংকট সংক্ষেপ (টেবিল)

বিষয়বিবরণ
সমস্যালাইটার জাহাজ তেলের অভাবে খালি বসে থাকা
প্রভাবিত বন্দরমোংলা, খুলনার রূপসা নদীর ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট
প্রধান পণ্যখাদ্যশস্য, সার, শিল্প কাঁচামাল, সিমেন্ট
তেলের সরবরাহ সমস্যাডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল আসছে না
প্রতিক্রিয়াবিলম্বের জন্য জরিমানা, উৎপাদন ও পরিবহনে ব্যাঘাত
জাহাজ মালিকদের অভিব্যক্তিতেলের অভাবে লাইটার নৌপরিবহন স্থবির
সম্ভাব্য প্রভাবআমদানি-রপ্তানি ব্যাঘাত, মৎস্য আহরণ ও শিল্প সরবরাহে সমস্যা
সংশ্লিষ্ট সংস্থামেঘনা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, এসকে এন্টারপ্রাইজ

বিশ্লেষণ

লাইটার জাহাজ সংকট দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যারা পণ্যখালাস ও কাঁচামাল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশেষত মোংলা ও খুলনা অঞ্চলের নদী পরিবহন এই সংকটের মুখে পড়েছে।

উপসংহার

জ্বালানি তেলের ঘাটতি মোংলা ও খুলনা বন্দরের কার্যক্রমে গভীর প্রভাব ফেলছে, যা আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন এবং নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে সংকটাপন্ন করেছে। দ্রুত তেল সরবরাহ ও লজিস্টিক সমাধান কার্যকর না হলে দেশের বাণিজ্য ও শিল্প চেইনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে।