আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, তখন হয়তো তিনি ভাবেননি যে তাঁর ম্যাচ ঘিরে আমেরিকার ফুটবল মানচিত্রই বদলে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, মেসির উপস্থিতি এখন কেবল মাঠের লড়াই নয়—এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও বিপণন ঘটনাও। তাঁর ম্যাচকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্লাব নিয়মিতভাবে নিজেদের ছোট স্টেডিয়াম ছেড়ে অনেক বড় ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজন করছে।
বাংলাদেশ সময় আজ রাত সাড়ে তিনটায় ইন্টার মায়ামি মুখোমুখি হবে ডিসি ইউনাইটেডের। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে বাল্টিমোরের এম অ্যান্ড টি ব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামে। সাধারণত এই স্টেডিয়ামটি আমেরিকান ফুটবল লিগের শক্তিশালী দল বাল্টিমোর রেভেনসের ঘরের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মেসির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে ডিসি ইউনাইটেড তাদের নিজস্ব স্টেডিয়াম অডি ফিল্ড ছেড়ে প্রায় ৪০ মাইল দূরে এই বৃহৎ ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অডি ফিল্ডে প্রায় ২০ হাজার দর্শক বসার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এম অ্যান্ড টি ব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ হাজার। অর্থাৎ স্টেডিয়াম পরিবর্তনের ফলে দর্শকসংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণটি খুবই বাস্তব—অর্থনৈতিক লাভ।
গত বছরও একই ধরনের উদাহরণ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব কলম্বাস ক্রু নিজেদের শহর ছেড়ে প্রায় ১৪০ মাইল দূরের ক্লিভল্যান্ডে ম্যাচ আয়োজন করেছিল, যেখানে তারা বড় স্টেডিয়াম ব্যবহার করে বিপুল দর্শক টানতে সক্ষম হয়েছিল। মূল আকর্ষণ ছিল একটাই—লিওনেল মেসি এবং তাঁর দল ইন্টার মায়ামি।
নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ম্যাচে স্টেডিয়াম পরিবর্তনের আর্থিক ও দর্শকসংখ্যাগত প্রভাব তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | ছোট স্টেডিয়াম | বড় স্টেডিয়াম |
|---|---|---|
| ধারণক্ষমতা | প্রায় ২০,০০০ | প্রায় ৭০,০০০+ |
| সম্ভাব্য দর্শক | ২০ হাজার | ৬০–৭০ হাজার |
| টিকিট বিক্রির সুযোগ | সীমিত | বহুগুণ বেশি |
| সম্ভাব্য আয় | তুলনামূলক কম | কয়েক গুণ বেশি |
শুধু দর্শকসংখ্যা বাড়ানোই নয়, টিকিটের দামও এই ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে বাল্টিমোরের এই ম্যাচের পুনঃবিক্রয় বাজারে সর্বনিম্ন টিকিটের দাম প্রায় ৭১ ডলার থেকে শুরু হয়েছে। আর মাঠের নিচতলার গ্যালারিতে বসে মেসিকে কাছ থেকে দেখার জন্য অনেক দর্শককে ৫০০ ডলারেরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। মেজর লিগ সকারের অনেক ঐতিহ্যবাহী সমর্থক মনে করেন, ক্লাবের নিজস্ব স্টেডিয়ামের পরিবেশ ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্লাব মালিক ও সংগঠকদের যুক্তি ভিন্ন। তাঁদের মতে, মেসির মতো বিশ্বতারকার উপস্থিতি নতুন দর্শক তৈরি করার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন বাজার তৈরি করা। বাল্টিমোর এমন একটি শহর যেখানে বড় কোনো পেশাদার ফুটবল দল নেই। এই সুযোগে ডিসি ইউনাইটেড সেখানে নিজেদের সমর্থকভিত্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যারা প্রথমে কেবল মেসিকে দেখতে স্টেডিয়ামে আসবেন, তাঁদের মধ্য থেকে অনেকেই ভবিষ্যতে নিয়মিত ফুটবল দর্শকে পরিণত হতে পারেন।
মেসি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তায় বড় পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর ম্যাচগুলোতে দর্শকসংখ্যা, টিভি দর্শক, স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে অনেক ক্লাবই মনে করছে, এই সুযোগকে যতটা সম্ভব কাজে লাগানো দরকার।
এ বছরের মাঝামাঝি সময়েই ৩৯ বছরে পা দেবেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। তাই তাঁকে সরাসরি মাঠে দেখার সুযোগ সীমিত সময়ের জন্যই রয়েছে। এই কারণেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেসিকে মাঠে দেখা যেন এক ধরনের ‘জীবনের তালিকার’ স্বপ্নপূরণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্টেডিয়াম পরিবর্তনের এই প্রবণতা কেবল অর্থ উপার্জনের কৌশল নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের প্রসার ঘটানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আর যতদিন মেসি খেলছেন, ততদিন এই ‘মেসি–ম্যানিয়া’ ঘিরে বড় স্টেডিয়ামের দরজা খোলা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
