মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর্থিক কষ্টে ভরা শামস সুমনের জীবন

নব্বই দশকের পরিচিত অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়, বরং এক সংগ্রামী জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি হিসেবেও সামনে এসেছে। গত ১৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিনোদন অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া; সহশিল্পী, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণে ভেসে যান।

বিশেষ করে সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয়ের আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট সুমনের জীবনের অজানা দিকগুলো সামনে নিয়ে আসে। জয়ের লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জীবনের শেষ সময়গুলোতে শামস সুমন তীব্র অর্থকষ্ট, মানসিক চাপ এবং নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে পর্যন্তও তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, এমনকি একসঙ্গে ইফতার করার কথাও স্মরণ করেছেন তিনি।

জয়ের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সুমনের অভিনয়জীবনের উজ্জ্বল দিকও। মঞ্চনাটকে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং চরিত্রে গভীর নিমগ্নতা তাঁকে সহকর্মীদের কাছে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছিল। একসময় জনপ্রিয় নাটকে বিশেষ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাঁকে আলাদাভাবে পারিশ্রমিক দিয়ে ডাকা হতো—যা তাঁর অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি বহন করে।

তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন। পরিবার বিদেশে থাকলেও দেশ ছাড়তে রাজি হননি সুমন। উন্নত জীবনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাতৃভূমির প্রতি টান তাঁকে দেশে বেঁধে রেখেছিল। ফলে জীবনের শেষভাগে তিনি একাকিত্ব, আর্থিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

নিচে শামস সুমনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
মৃত্যু১৭ মার্চ, সন্ধ্যা ৬:৪৩
পেশামঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা
কর্মজীবনের সময়নব্বই দশক থেকে সক্রিয়
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যশক্তিশালী অভিনয়, শুদ্ধ উচ্চারণ
ব্যক্তিগত অবস্থাঅর্থকষ্ট, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা
পরিবারলন্ডনে অবস্থান
শেষ সাক্ষাৎকার২০২৪ সালের জুলাই, ‘১৩টি প্রশ্ন’

জয়ের লেখায় আরও উঠে এসেছে—সুমন জীবনের শেষ সময়ে গভীর হতাশায় ভুগছিলেন। কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, ব্যক্তিগত সংকট থেকে বের হতে না পারা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। বিশেষ করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাঁকে আরও মানসিক চাপে ফেলেছিল।

তাঁকে ‘হিডেন সুপারস্টার’ আখ্যা দিয়ে জয় উল্লেখ করেন, জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি না পেলেও মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, এক অবহেলিত কিন্তু অসাধারণ প্রতিভাবান শিল্পীকে হারিয়েছে দেশ।

শামস সুমনের জীবন যেন এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—খ্যাতি ও প্রতিভা থাকলেও আর্থিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতি না থাকলে জীবন কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ তিনি। তাঁর মৃত্যু শুধু শোকের নয়, বরং শিল্পীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ তৈরি করেছে।