মুন্সীগঞ্জে গণপিটুনিতে প্রাণ গেল দুই যুবকের

মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলায় চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত গণপিটুনিতে দুই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে হলদিয়া ইউনিয়নের সাতঘরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহতরা হলেন গোয়ালিমান্দ্রা এলাকার বেদেপল্লীর ফরহাদ মিয়ার ছেলে সাগর (৩০) এবং মোহাম্মদ শহিদুলের ছেলে ছানারুল (৩০)। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কমিউনিটি ক্লিনিকের বৈদ্যুতিক তার চুরির সময় স্থানীয়রা তাদের দেখতে পেয়ে আটক করেন। পরে উত্তেজিত জনতা তাদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত অবস্থায় দুই যুবককে উদ্ধার করে লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার সারসংক্ষেপ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

বিষয়বিবরণ
ঘটনাচুরির অভিযোগে গণপিটুনি
স্থানসাতঘরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক, হলদিয়া ইউনিয়ন
উপজেলালৌহজং
জেলামুন্সীগঞ্জ
সময়৪ মার্চ, ভোর ৩টা
নিহতসাগর (৩০), ছানারুল (৩০)
গ্রেপ্তার৩ জন
বর্তমান অবস্থাতদন্তাধীন

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একই ইউনিয়নের সাতঘরিয়া এলাকায় একটি খামার থেকে লক্ষাধিক টাকার ছাগল চুরির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় চোর আতঙ্ক বিরাজ করছিল। নিহত দুই যুবক ওই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ ছিল। ভোরে কমিউনিটি ক্লিনিকে চুরির চেষ্টা করলে তাদের হাতেনাতে আটক করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এরপরই উত্তেজিত জনতা তাদের মারধর করে।

এ বিষয়ে লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, “সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তবে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, গণপিটুনি কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের পথ নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলে তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। জনতার হাতে বিচার সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরির সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এই ঘটনায় নিহত দুই পরিবারের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোক। একই সঙ্গে এলাকাবাসীর মধ্যেও অনুশোচনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সচেতন মহল মনে করছে, অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনের প্রতি আস্থা ও ধৈর্য বজায় রাখাই হতে পারে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।