ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ মারিয়া কোরিনা মাচাদো চলতি সপ্তাহে যেকোনো মূল্যে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল—নিজে উপস্থিত থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করা। তবে আত্মগোপনে থাকা একজন বিরোধী নেত্রীর জন্য এই যাত্রা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। সামরিক তল্লাশিচৌকি এড়িয়ে দেশত্যাগ, উত্তাল সমুদ্র পাড়ি এবং মার্কিন ড্রোন হামলার শঙ্কা—সব মিলিয়ে তাঁর এই সফর ছিল রীতিমতো এক নাটকীয় গোপন অভিযান।
বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী, মাচাদো কয়েকটি নৌযানের একটি বহরের মাধ্যমে গোপনে ভেনেজুয়েলা ত্যাগ করেন। তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপে পৌঁছানো, যেখানে আগে থেকেই একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযান শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন ভেনেজুয়েলার আশপাশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান দমনের নামে মার্কিন বাহিনী ধারাবাহিকভাবে নৌযানে হামলা চালাচ্ছিল। এসব অভিযানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সমুদ্রে যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তেই অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক ঘিরে ছিল মাচাদো ও তাঁর সহযোগীদের।
শেষ পর্যন্ত তিনি অসলোতে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও সময়মতো নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। বুধবার গভীর রাতে তিনি নরওয়েতে পৌঁছান। তবুও মাদুরো সরকারের নজরদারি এড়িয়ে নিরাপদে ইউরোপে পৌঁছানোকে তাঁর সমর্থকেরা বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও মাচাদো এখনো ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক নাম।
এই গোপন অভিযানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরিচালিত সংস্থাটি বিশেষ উদ্ধার অভিযান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ব্যক্তিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজে অভিজ্ঞ। মাদুরো প্রশাসন যখন মাচাদোকে ধরতে মরিয়া, তখন এমন সুসংগঠিত সহায়তা ছাড়া তাঁর পক্ষে দেশ ছাড়ার সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে।
সংস্থাটির নাম ‘গ্রে বুল রেসকিউ’। এর প্রধান ব্রায়ান স্টার্ন জানান, এটি ছিল তাদের প্রায় ৮০০তম উদ্ধার অভিযান। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা স্টার্ন বলেন, মাচাদোর মতো একজন পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গোপনে উদ্ধার করা তাদের জন্যও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
যদিও মাচাদোর একজন প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন যে ‘গ্রে বুল রেসকিউ’ তাঁকে ভেনেজুয়েলা ছাড়তে সহায়তা করেছে, তবে অভিযানের সব বিস্তারিত আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রথম প্রকাশ করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
মাচাদোর গোপন অভিযানের সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নাম | মারিয়া কোরিনা মাচাদো |
| পরিচয় | ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী |
| গন্তব্য | অসলো, নরওয়ে |
| যাত্রাপথ | নৌযান → ক্যারিবীয় দ্বীপ → উড়োজাহাজ |
| সহায়তাকারী সংস্থা | গ্রে বুল রেসকিউ |
| সংস্থার অবস্থান | ট্যাম্পা, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র |
| অভিযানের ঝুঁকি | সামরিক তল্লাশি, সমুদ্রপথ, ড্রোন হামলার শঙ্কা |
| রাজনৈতিক গুরুত্ব | মাদুরো সরকারের নজর এড়িয়ে বড় অর্জন |
এই ঘটনা শুধু একটি নাটকীয় দেশত্যাগ নয়, বরং ভেনেজুয়েলার চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি প্রতীকী অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।