ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কয়েক দশকের দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ বর্তমানে এক ভয়াবহ ও চূড়ান্ত সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সীমিত পরিসরে সামরিক হামলার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নাটকীয়ভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশ্বনেতারা এখন উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন, কূটনীতি কি শেষ পর্যন্ত কামানের গোলার কাছে হার মানবে কি না।
ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন ছক ও সামরিক প্রস্তুতি
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি জানান যে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছেন। যদিও তিনি একে ‘সীমিত আকার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তবে সামরিক বিশ্লেষকরা একে বড় কোনো যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবিটি করেছেন সাবেক সিআইএ (CIA) কর্মকর্তা জন কিরিয়াকো। একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছেন যে, আগামী সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যেই ইরান আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি জানান, হামলার সময়সীমা নিয়ে জনসমক্ষে ধোঁয়াশা তৈরি করা হলেও ভেতরে ভেতরে পেন্টাগন যুদ্ধের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীর অবস্থান বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন এই দাবির পালে হাওয়া দিচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কঠোর পাল্টা হুঁশিয়ারি
মার্কিন এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিপরীতে কঠোর অবস্থানে গিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক ধারাবাহিক বার্তায় তিনি মার্কিন সামরিক শক্তির দম্ভকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। খামেনি বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিনিয়ত বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বড়াই করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীও মাঝে মাঝে এমন প্রচণ্ড আঘাত পেতে পারে যা থেকে তারা আর কখনোই উঠে দাঁড়াতে পারবে না।”
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ বিপজ্জনক সামরিক সরঞ্জাম হতে পারে, তবে সেই যুদ্ধজাহাজকে মুহূর্তেই সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে যে ক্ষেপণাস্ত্র, সেটি তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। খামেনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে চেষ্টা আমেরিকা করে আসছে, তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে তিনি আমেরিকার পরাজয়ের দীর্ঘ স্বীকারোক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নিচে বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও পদক্ষেপ | ইরানের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া |
| সামরিক ঘোষণা | সীমিত আকারে হামলার পরিকল্পনা খতিয়ে দেখা। | যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধের ঘোষণা। |
| সম্ভাব্য সময় | সোমবার বা মঙ্গলবার (অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি)। | পূর্ণ সতর্কাবস্থায় রয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড। |
| প্রতিরক্ষা কৌশল | পারস্য উপসাগরে অতিরিক্ত রণতরী ও বোমারু বিমান মোতায়েন। | শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও আত্মঘাতী ড্রোনের প্রস্তুতি। |
| রাজনৈতিক অবস্থান | শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। | চার দশকের ব্যর্থতা মনে করিয়ে দিয়ে পাল্টাহুঁশিয়ারি। |
কূটনীতি বনাম সামরিক সংঘাত
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই চলতি মাসের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে পরমাণু চুক্তি (JCPOA) নিয়ে দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু হয়েছিল। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতেই আমেরিকা যুদ্ধের এই নাটকীয় আবহ তৈরি করছে। তবে ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভুল হিসাবনিকাশ সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালায়, তবে কেবল পারস্য উপসাগর নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনার সাথে এই সম্ভাব্য হামলা যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য একটি অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন বিশ্ববাসীর নজর ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
