রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে আজ এক বিষণ্ন নীরবতা বিরাজ করছে। যে ক্যাম্পাসে প্রাণচঞ্চল পদচারণায় মুখর থাকার কথা ছিল এক মেধাবী তরুণীর, সেখানে আজ কেবলই শোকের ছায়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোনিয়া ইসলামের অকাল প্রয়াণ কেবল একটি মেধাবী প্রাণের অবসান নয়, বরং একটি পরিবারের শেষ প্রদীপটি নিভে যাওয়ার এক হৃদয়বিদারক আখ্যান। মানসিক বিষণ্নতা ও পারিবারিক শোকের বোঝা বইতে না পেরে সোনিয়ার এই চলে যাওয়া পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং স্থানীয় জনপদকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
গত কয়েকদিন ধরেই সোনিয়া ইসলাম মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ছিলেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তাঁর এই অস্বাভাবিক মৃত্যু সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান যে, সোনিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত না করার জন্য বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছিল। শোকার্ত পরিবারের আবেগ এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুমতি প্রদান করেছে।
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থানায় একটি অপমৃত্যুর (UD) মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বা মানসিক চাপের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছে, তবে ঘটনার পারিপার্শ্বিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একটি পরিবারের নিঃস্ব হওয়ার করুণ গল্প
সোনিয়া ইসলামের জীবনের এই করুণ পরিণতির নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক শোকের ইতিহাস। সোনিয়ার বাবা শামসুল হক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে হাজারো মানুষের সেবা করলেও নিজের জীবনের ট্র্যাজেডি তিনি রুখতে পারেননি। কয়েক বছর আগে এক মর্মান্তিক ঘটনায় তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তানকে হারান। পুত্রকে হারানোর সেই গভীর ক্ষত শুকানোর আগেই এবার একমাত্র কন্যা সোনিয়াকেও হারাতে হলো তাঁকে।
পুত্রের মৃত্যুর পর সোনিয়াই ছিলেন শামসুল হকের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং আশার আলো। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে এখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃসন্তান। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না, যেখানে বার্ধক্যের শেষ সময়ে তিনি তাঁর দুই সন্তানকেই কবরে রেখে আসলেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
নিচে এই দুঃখজনক ঘটনার মূল তথ্যগুলো একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| শিক্ষার্থীর নাম | সোনিয়া ইসলাম। |
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠান | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। |
| বাবার নাম ও পরিচয় | শামসুল হক (অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, রামেক হাসপাতাল)। |
| মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ | মানসিক বিষণ্নতা ও পারিবারিক শোকের প্রভাব। |
| প্রশাসনিক ব্যবস্থা | ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি এবং অপমৃত্যু মামলা। |
| পারিবারিক অবস্থা | ইতিপূর্বে পুত্র হারানো পরিবারটি এখন নিঃসন্তান। |
| তদন্তকারী থানা | মতিহার থানা, রাজশাহী। |
মানসিক স্বাস্থ্য ও ছাত্রসমাজের বর্তমান সংকট
সোনিয়ার এই মৃত্যু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আবারও বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পারিবারিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত শোক এবং পড়াশোনার চাপের এক ত্রিমুখী আবর্তে পড়ে পিষ্ট হন। সোনিয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভাইয়ের অকাল মৃত্যু তাঁর মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা হয়তো তিনি কাউকেই প্রকাশ করতে পারেননি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও কাউন্সিলিং সেন্টারের তথ্যমতে, করোনাকালীন সময় এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাকীত্ব ও বিষণ্নতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক শিক্ষার্থীই মনের ভেতরে জমে থাকা কষ্টের কথাগুলো বিশেষজ্ঞের কাছে প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সোনিয়ার এই বিয়োগান্তক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল একাডেমিক ফলাফলই জীবনের সব নয়; বরং মানসিক প্রশান্তি এবং কাছের মানুষদের পাশে থাকাটা কতটা জরুরি।
শোক ও সহমর্মিতা
সোনিয়া ইসলামের মৃত্যুতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। তাঁর সহপাঠীরা জানিয়েছেন, সোনিয়া অত্যন্ত নম্র ও মেধাবী ছিলেন, কিন্তু কিছুদিন ধরে তিনি সবার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এই নিভৃতে চলে যাওয়া যেন সমাজের সেই স্তব্ধ মানুষগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা হাসিমুখের আড়ালে নিজেদের যন্ত্রণাকে লুকিয়ে রাখে।
শামসুল হকের মতো একজন অসহায় বাবার কান্নায় আজ রাজশাহীর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যে বাবা তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের মানুষ করতে চেয়েছিলেন, আজ তিনি একেবারে নিঃস্ব। সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শোকাতুর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি, তবে সোনিয়াদের মতো আরও অনেক মেধাবী প্রাণ হয়তো এভাবেই হারিয়ে যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, সোনিয়া ইসলামের প্রস্থান কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়া এবং বিষণ্নতায় ভোগা প্রিয়জনের হাতটি শক্ত করে ধরার সময় এখনই। রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল হয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সোনিয়ার বিদেহী আত্মার শান্তি এবং তাঁর শোকার্ত পিতার এই অপূরণীয় ক্ষতি সইবার শক্তি প্রার্থনা করছে পুরো দেশ।
