ইকুয়েডরে মার্কিন সামরিক অভিযান: নেপথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে সরাসরি সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (SOUTHCOM) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তারা ইকুয়েডরের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে মিলে দেশটিতে একটি সমন্বিত সামরিক ‘অভিযান’ শুরু করেছে। মূলত মাদক পাচার রোধ এবং ইকুয়েডরের অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ‘সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর’ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

অভিযানের প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত গুরুত্ব

ইকুয়েডর ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের দুই বৃহত্তম কোকেন উৎপাদনকারী দেশ—কলম্বিয়া ও পেরুর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই অবস্থানের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। তথ্যমতে, এই অঞ্চলের উৎপাদিত মাদকের প্রায় ৭০ শতাংশ ইকুয়েডরের বন্দর ও সীমান্ত ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইকুয়েডরকে বর্তমানে লাতিন আমেরিকার অন্যতম সহিংস রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক সম্রাটদের আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিতে ওয়াশিংটন বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে ড্রোন এবং উচ্চ প্রযুক্তির নজরদারি বিমানের মাধ্যমে মাদক পাচারকারীদের অবস্থান শনাক্ত করে ইকুয়েডরীয় বাহিনীকে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করছে মার্কিন বিশেষজ্ঞরা।


ইকুয়েডরের বর্তমান নিরাপত্তা চিত্র একনজরে

নিচে ইকুয়েডরের নিরাপত্তা সংকট এবং মাদক পাচার সংক্রান্ত মূল তথ্যাদি তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ ও প্রভাব
ভৌগোলিক অবস্থানকলম্বিয়া ও পেরুর মাঝে অবস্থিত হওয়ায় মাদক পাচারের প্রধান রুট।
মাদক পাচারের হারউৎপাদিত কোকেনের প্রায় ৭০% এই দেশের ভেতর দিয়ে পাচার হয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্বপ্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া, যিনি মার্কিন সহায়তার কট্টর সমর্থক।
মার্কিন উপস্থিতিমান্তা বন্দর ও কৌশলগত স্থানে ড্রোন ও নজরদারি বিমান মোতায়েন।
প্রধান চ্যালেঞ্জনার্কো-সন্ত্রাসবাদ এবং শক্তিশালী ড্রাগ কার্টেলদের রক্তক্ষয়ী লড়াই।

প্রেসিডেন্ট নোবোয়ার নীতি ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক

২০২৩ সালে ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইকুয়েডরের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং আমেরিকার সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির চুক্তি করেন। যদিও ইকুয়েডরের সংবিধানে এবং সাম্প্রতিক গণভোটে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে জনগণের পক্ষ থেকে নেতিবাচক সংকেত ছিল, তবুও ‘বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তি’র আওতায় মার্কিন সেনাদের সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট নোবোয়া যুক্তি দিয়েছেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বর্তমানে অপরিহার্য। তবে সমালোচক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকায় আমেরিকা তাদের হারানো সামরিক প্রভাব পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

আমেরিকার এই পদক্ষেপে কেবল মাদক নির্মূল হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আরও উগ্র হয়ে উঠতে পারে, যা পাল্টা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার জন্ম দেবে। ইকুয়েডরের সাধারণ মানুষ বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে তারা বছরের পর বছর ধরে চলা মাদক সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চান, অন্যদিকে নিজ ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান তাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।

ওয়াশিংটন দাবি করছে, ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ’ মোকাবিলায় এই যৌথ কার্যক্রম লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের জন্য একটি সফল মডেল হয়ে থাকবে। তবে সামনের দিনগুলোতে এই সামরিক অভিযান মাদক পাচারের মানচিত্র বদলাতে পারবে নাকি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের দিকে দেশটিকে ঠেলে দেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।