সিডনির সন্ধ্যাকাশে আলো-আঁধারের মিশেলে যখন ম্যাচের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন গ্যালারির এক কোণে লাল-সবুজের উচ্ছ্বাস যেন আলাদা এক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। দর্শকসংখ্যা হয়তো ছয় হাজারের বেশি ছিল না, কিন্তু বাংলাদেশি সমর্থকদের গর্জন মাঠজুড়ে এমন প্রতিধ্বনি তুলছিল, যেন হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে দলকে এগিয়ে নিচ্ছে।
এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল যে সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। স্কোরলাইন ২-০ হলেও ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন মনিকা, মারিয়া, ঋতুপর্ণারা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে হার এড়ানোই ছিল বড় সাফল্য, আর সেটিই অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
ম্যাচের পরিসংখ্যান
| সূচক | চীন | বাংলাদেশ |
|---|---|---|
| বল দখল (%) | ৫৯ | ৪১ |
| মোট পাস | ৩৭৫ | ২৫৭ |
| গোল | ২ | ০ |
পরিসংখ্যান বলছে চীন এগিয়ে, তবে মাঠের লড়াই বলছে ভিন্ন গল্প। কোচ পিটার বাটলারের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট—প্রথমে রক্ষণ শক্তিশালী করা, তারপর সুযোগ বুঝে আক্রমণ। অভিজ্ঞ রূপনা চাকমার পরিবর্তে তরুণ মিলি আক্তারকে গোলরক্ষক হিসেবে নামানো ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত, যা ম্যাচে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রক্ষণভাগে শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার, আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিসকু ও নবীরন খাতুন সম্মিলিতভাবে চীনের দ্রুতগতির আক্রমণ ৪২ মিনিট পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখেন। বিশেষ করে মিলি আক্তারের অসাধারণ সেভ ম্যাচের শুরুতেই দলকে আত্মবিশ্বাস জোগায়। ১২ মিনিটে নিশ্চিত গোল থেকে দলকে বাঁচিয়ে তিনি নিজের সক্ষমতার দারুণ প্রমাণ দেন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে ১৪ মিনিটে। ঋতুপর্ণা চাকমার দুর্দান্ত দৌড় ও শক্তিশালী শট প্রায় গোলেই পরিণত হচ্ছিল, কিন্তু চীনের গোলরক্ষক চেন চেন তা প্রতিহত করেন। এই আক্রমণ স্পষ্ট করে দেয়—বাংলাদেশ শুধু রক্ষণাত্মক খেলেনি, আক্রমণেও ছিল সমান সাহসী।
মাঝমাঠে মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্দার নিরলস পরিশ্রম দলের ভারসাম্য বজায় রাখে। একক স্ট্রাইকার হিসেবে শামসুন্নাহার জুনিয়র প্রতিপক্ষের শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যান।
২৪ মিনিটে চীনের গোল ভিএআর প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইড হওয়ায় বাতিল হয়, যা বাংলাদেশকে সাময়িক স্বস্তি দেয়। তবে প্রথমার্ধের শেষদিকে ওয়াং সুয়াংয়ের দুর্দান্ত শট এবং অতিরিক্ত সময়ে দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোল ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে হালিমা, তহুরা খাতুন ও স্বপ্না রানীকে নামানো হয়। এতে গতি বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত গোল পাওয়া যায়নি। তবুও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এই ম্যাচ প্রমাণ করেছে, অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের মেয়েরা এখন এশিয়ার সেরাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে। এই হার পরাজয় নয়, বরং ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি। ৬ মার্চ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতেই পারে বাংলাদেশ।
