স্পেনীয় ফুটবলের ধুলোবালি আর ঘাসের আস্তরণে ঢাকা পড়ে থাকা এক বিস্ময়কর চরিত্রের নাম আনা কারমোনা রুইজ, যাকে ফুটবল বিশ্ব চেনে ‘নিতা’ নামে। আজ থেকে ১০০ বছর আগে, যখন নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল কঠিন এবং ফুটবল খেলা ছিল অকল্পনীয়, তখন এক সাহসী কিশোরী পুরুষ শাসিত সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন। তবে তার এই লড়াই ছিল ছদ্মবেশের আড়ালে। সম্প্রতি মালাগার ক্রীড়া সাংবাদিক হেসুস হুরতাদোর গবেষণায় উঠে এসেছে এই ‘মেঘে ঢাকা তারা’র জীবনের অজানা সব অধ্যায়।
Table of Contents
নিতার জন্ম ও ফুটবলের নেশা
১৯০৮ সালের ১৬ মার্চ স্পেনের মালাগার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নিতা। বাবা আন্দ্রেস ছিলেন বন্দরের শ্রমিক। বন্দরের পাশে ফাঁকা জায়গায় ইংরেজ নাবিকদের ফুটবল খেলা দেখেই ফুটবলের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তবে সেই সময়ে স্পেনের সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের ফুটবল খেলা ছিল এক প্রকার নিষিদ্ধ ও ‘পাপ’। নিতার ফুটবল খেলার নেশা বাবা-মা পছন্দ করতেন না, যার ফলে তাকে বহুবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
ছদ্মবেশের আড়ালে ফুটবল যাত্রা
নিতার ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল পাদরি ফ্রান্সিসকো মিগুয়েজের। তার প্রশ্রয়েই নিতা নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটান। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল লিঙ্গ পরিচয় লুকিয়ে মাঠে নামা। নিতা যখন বড় হচ্ছিলেন, তখন তার নারীসুলভ শারীরিক গঠন ঢেকে রাখার জন্য তিনি এক অনন্য কৌশল অবলম্বন করেন।
বুক চাপা রাখা: স্ফীত বুক সমান করার জন্য তিনি সুতি কাপড়ের শক্ত আস্তরণ ব্যবহার করতেন।
ঢোলা পোশাক: শরীরের গড়ন বোঝাতে তিনি সবসময় ঢোলা প্যান্ট ও ব্যাগি টি-শার্ট পরতেন।
মাথার টুপি: নিজের লম্বা চুল ছেঁটে ফেলে মাথায় পুরু উলের টুপি (বেরেট) পরতেন।
নাম পরিবর্তন: সতীর্থদের কাছে তিনি পরিচিত হন ‘ভেলেতা’ নামে।
ভেলেজ ক্লাব ও ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’
১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত নিতা স্পেনের চতুর্থ বিভাগের দল ভেলেজ ক্লাবে খেলেন। অবাক করার বিষয় হলো, তার সতীর্থরা জানতেন যে নিতা একজন নারী। কিন্তু তার অসাধারণ ফুটবল শৈলী দেখে তারা এক ‘পারস্পরিক সমঝোতা’ বা জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টি গোপন রাখেন। নিতা ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঝমাঠে খেলা পরিচালনা করতেন।
নিতার ফুটবল ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান ও তথ্য
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| আসল নাম | আনা কারমোনা রুইজ |
| ডাকনাম | নিতা বা ভেলেতা |
| জন্ম | ১৬ মার্চ, ১৯০৮ (মালাগা, স্পেন) |
| খেলার পজিশন | কুশলী মিডফিল্ডার (১০ নম্বর জার্সি) |
| প্রধান ক্লাব | ভেলেজ ক্লাব (১৯২৭-১৯২৯) |
| মৃত্যু | ১৯৪০ (৩২ বছর বয়সে, টাইফাস জ্বরে) |
সমাজের নিষ্ঠুরতা ও করুণ পরিণতি
নিতার এই ছদ্মবেশের জীবন খুব একটা মসৃণ ছিল না। একসময় তার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে প্রতিবেশীরা তাকে অপমান করতে শুরু করে। তাকে এমনকি পুলিশের ব্যারাকে ও বাড়িতেও আটকে রাখা হয়েছিল। ফুটবল ফেডারেশন মেয়েদের মাঠে প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে নিতার ফুটবল ক্যারিয়ার থমকে যায়। ১৯৪০ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে টাইফাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এই ফুটবল বীরঙ্গনা মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী, তাকে ‘স্পোর্টিং ক্লাব ডি মালাগা’র জার্সিতে সমাহিত করা হয়।
নিতা হয়তো বিশ্বের প্রথম নারী ফুটবলার নন, কিন্তু ছেলেদের বেশভূষায় ছেলেদের সাথে সমান তালে লড়াই করা এক অনন্য উদাহরণ। মালাগার হুরতাদোর লেখনীতে আজ সেই নিতা বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে পুনরায় স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে ফিরে এসেছেন।
