লক্ষ্মীপুর, শুক্রবার – কুমিল্লার সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মাদ্রাসাশিক্ষক মুফতি আব্দুল মমিন, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে একই কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার বাদ জুমআ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চরশাহী ইউনিয়নের তিতারকান্দি গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাদের শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়। একসঙ্গে চারটি লাশ, একসঙ্গে জানাজা এবং পাশাপাশি কবর—এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য এলাকায় গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে।
Table of Contents
আবেগঘন জানাজা ও দাফন
বশাহাজী পাটওয়ারী বাড়ি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ফয়সাল আহমাদ, যিনি নিহতদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও। জানাজায় অংশ নিতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী উপস্থিত হন।
চারটি কফিন একসঙ্গে সারিবদ্ধভাবে রাখা হলে উপস্থিত জনতার মাঝে নেমে আসে শোকের নীরবতা। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানাজা শেষে একই কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খুঁড়ে তাদের দাফন করা হয়—যা উপস্থিত মানুষের হৃদয়ে গভীর নাড়া দেয়।
নিহতদের পরিচয় ও জীবনের প্রেক্ষাপট
মুফতি আব্দুল মমিন ছিলেন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন মাদ্রাসাশিক্ষক। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। জীবিকার প্রয়োজনে রাজধানীতে অবস্থান করলেও পরিবারের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল।
তার সঙ্গে নিহত হয়েছেন—
- স্ত্রী ঝর্না বেগম (৪০),
- ছেলে সাইফ (৭),
- মেয়ে লাবিবা (১৮)।
এছাড়া দুর্ঘটনায় প্রাইভেটকারের চালক জামাল হোসেন (৫২) নামের আরেক ব্যক্তি নিহত হন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মমিন নিজ গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য জমি কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। ঈদের ছুটিতে তিনি পরিবারসহ শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করতেন। কিন্তু সেই আনন্দময় সফরই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় চিরবিদায়ের যাত্রায়।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কালাকচুয়া এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস ও প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দুর্ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষটি ছিল অত্যন্ত তীব্র, যার ফলে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। গুরুতর আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও প্রাণহানি ঘটে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতি, অসতর্ক ড্রাইভিং অথবা যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিস্তারিত তদন্ত করছে।
ঘটনাপ্রবাহ এক নজরে
| বিষয় | তথ্য/বিস্তারিত |
|---|---|
| নিহত পরিবার | মুফতি আব্দুল মমিন, স্ত্রী ও দুই সন্তান |
| অতিরিক্ত নিহত | প্রাইভেটকার চালক জামাল হোসেন |
| দাফনের স্থান | তিতারকান্দি, চরশাহী ইউনিয়ন, লক্ষ্মীপুর |
| জানাজার স্থান | বশাহাজী পাটওয়ারী বাড়ি জামে মসজিদ |
| দুর্ঘটনার স্থান | কালাকচুয়া, কুমিল্লা (ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক) |
| দুর্ঘটনার ধরন | বাস-প্রাইভেটকার মুখোমুখি সংঘর্ষ |
| সম্ভাব্য কারণ | অতিরিক্ত গতি/নিয়ন্ত্রণ হারানো (তদন্তাধীন) |
শোক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
একটি পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যু স্থানীয় জনগণকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, এমন দৃশ্য জীবনে খুব কমই দেখা যায়। বিশেষ করে ছোট্ট শিশু সাইফের নিথর দেহ এবং তরুণী লাবিবার মৃত্যু উপস্থিত মানুষের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।
মাওলানা ফয়সাল আহমাদ শোক প্রকাশ করে বলেন, “একটি দুর্ঘটনায় আমার আপনজনদের এভাবে হারানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করেছে। নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং বেপরোয়া যান চলাচল এখন জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
উপসংহার
মুফতি আব্দুল মমিন ও তার পরিবারের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার সংকটের প্রতিচ্ছবি। একই পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যু জাতির জন্য এক বেদনাদায়ক স্মারক হয়ে থাকবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে—এমন আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
