উত্তরবঙ্গের বগুড়ায় অনুষ্ঠিত এবারের সংগীত আয়োজনটি মধ্যরাতেও দর্শকের উচ্ছ্বাসে ভরপুর ছিল। শহরের মম ইন-এর উন্মুক্ত সবুজ প্রাঙ্গণে গভীর রাত পেরিয়ে গেলেও দর্শকদের আগ্রহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, মঞ্চের পরিবেশনা ততই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। এই আবহেই মঞ্চে উঠে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা তাঁর কণ্ঠে পরিবেশন করেন বহুল জনপ্রিয় গান ‘সাধের লাউ বানাইলাম বৈরাগী’। মুহূর্তেই দর্শকেরা গানে গলা মিলিয়ে সৃষ্টি করেন এক অনন্য আবেগঘন পরিবেশ।
পরিবেশনার মাঝেই চমক হিসেবে মঞ্চে উঠে আসেন আরেক বর্ষীয়ান শিল্পী খুরশীদ আলম। ‘চুমকি চলেছে একা’ গানের সুরে তিনি নাচে যোগ দিলে দর্শকদের করতালিতে পুরো প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। উপস্থিত অনেকেই এই মুহূর্তটিকেই পুরো আয়োজনের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
রুনা লায়লা তাঁর পরিবেশনায় বৈচিত্র্য এনে প্রথমে একটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন, যার রচয়িতা গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুরকার শফিক তুহিন। পরে তিনি খালি কণ্ঠে গেয়ে শোনান সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি গান। এ সময় তাঁর সঙ্গে মঞ্চে যোগ দেন সমকালীন শিল্পী ইমরান মাহমুদুল ও কোনাল। পাশাপাশি তিনি ‘সাধের লাউ’ গানটির সঙ্গে জড়িত অতীত স্মৃতির কথা তুলে ধরলে দর্শকদের মধ্যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সাবিনা ইয়াসমীন তাঁর সুরেলা কণ্ঠে ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গান দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। এরপর ভাওয়াইয়া ও লোকধারার গানে তিনি শ্রোতাদের নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে নেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এই আয়োজনে আরও অংশ নেন খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, অণিমা রায়, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা, লুইপা, মাহতিম শাকিব, এঞ্জেল নূরসহ বহু শিল্পী।
রাত গভীর হওয়ার পর বগুড়ার দুই পরিচিত মুখ অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের অংশগ্রহণে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি অবলম্বনে একটি নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়, যা দর্শকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজনটি এবার উত্তরবঙ্গে বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যার শুরুতে সমবেত কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী বক্তব্যে আয়োজকেরা সংগীতশিল্পীদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং এ ধরনের আয়োজন দেশের সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এবারের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকা
| বিভাগ | বিজয়ী | উল্লেখযোগ্য কাজ |
|---|---|---|
| আজীবন সম্মাননা | কনকচাঁপা | সংগীতে সামগ্রিক অবদান |
| বিশেষ সম্মাননা | কাঙ্গালিনী সুফিয়া | লোকসংগীত |
| আধুনিক গান (শিল্পী) | লিজা | ‘খুব প্রিয় আমার’ |
| সুরকার | বাপ্পা মজুমদার | ‘অবশেষে’ |
| গীতিকার | তারেক আনন্দ, শাহনাজ কাজী | ‘প্রেমবতী’, ‘মা’ |
| দ্বৈত সংগীত | ইমরান মাহমুদুল ও সিঁথি সাহা | ‘প্রেম বুঝি’ |
| লোকসংগীত | বিউটি | ‘চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক’ |
| চলচ্চিত্র গান | আতিয়া আনিসা | ‘ছোট্ট সোনা’ |
| ব্যান্ড | মেট্রিক্যাল | ‘গণতন্ত্রের ঘুড়ি’ |
| নবাগত শিল্পী | সভ্যতা | ‘অধিকার’ |
মোট ১৮টি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হয়, যেখানে আধুনিক গান থেকে শুরু করে লোকসংগীত, চলচ্চিত্র, ব্যান্ড ও ইউটিউবভিত্তিক সংগীত—সব ক্ষেত্রেই শিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই আয়োজনকে ঘিরে বগুড়া শহরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যানার, ফেস্টুন ও তারকাদের আগমনে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেন্যুতে দর্শকের ঢল নামে এবং আলোঝলমলে মঞ্চে শুরু হয় জমকালো অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের মিলনমেলা, বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এবারের আয়োজনটি দেশের সংগীতাঙ্গনে এক স্মরণীয় সংযোজন হয়ে থাকল।
