ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তুরস্ক ও পাকিস্তান সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। একদিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মার্কিন দূতের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে শান্তি ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন।
আঙ্কারায় তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আঙ্কারায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। যদিও এই আলোচনার বিস্তারিত বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের সম্ভাব্য প্রভাব এবং সিরিয়া সীমান্তে এর সংঘাতময় প্রতিক্রিয়া নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করেছেন। আগামী শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরের ঠিক আগেই মার্কিন দূতের সঙ্গে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নিচে সাম্প্রতিক এই কূটনৈতিক তৎপরতার একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
সারণি: মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ
| দেশ | প্রতিনিধি | আলোচনার পক্ষ | মূল লক্ষ্য ও বার্তা |
| তুরস্ক | হাকান ফিদান (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) | মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও বিশেষ দূত | আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সিরিয়া পরিস্থিতি সমন্বয় |
| পাকিস্তান | ইসহাক দার (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) | আব্বাস আরাগচি (ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) | কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান |
| ইরান | আব্বাস আরাগচি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) | তুরস্ক সরকার (আসন্ন সফর) | দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা |
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পাকিস্তানও তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, যেকোনো সামরিক সংঘাত এড়াতে ‘আলোচনা ও কূটনীতিই’ সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র কার্যকর পথ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই দেশই একে অপরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বর্তমান উত্তেজনা কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লেবানন, গাজা এবং সিরিয়ায় চলমান সংঘাতের সঙ্গে ইরানের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই অবস্থায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যস্থতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তুরস্কের পক্ষ থেকে আগামী শুক্রবারের সফরটিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো সমঝোতার আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আঙ্কারা এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘ব্যাক-চ্যানেল’ বা গোপন যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান তার পশ্চিমা প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
