মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা শুধু বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করছে না, বরং সরাসরি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা, অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, এবং আন্তর্জাতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে তেল-নির্ভর বাংলাদেশের জন্য এই সংকট সাধারণ মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমান নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন অর্থনৈতিক প্রণালীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ, বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা ও বাজেট প্রস্তুতি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘর্ষ এই কর্মকাণ্ডে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। কোনো ব্যাঘাতের কারণে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা দেশে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। বাংলাদেশ মূলত অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও এলপিজি আমদানি করে এবং এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সম্প্রতি কাতার এনার্জি ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে, যা দেশে জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও তেলের বাজারের প্রভাব
| উপাদান | বর্তমান মূল্য/প্রভাব | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ব্রেন্ট ক্রুড তেল | $87/বারেল | এক সপ্তাহে প্রায় ২০% বৃদ্ধি |
| সম্ভাব্য দাম (দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত) | $100–$150/বারেল | মূল্যস্ফীতি ও বাজেটে চাপ বাড়াতে পারে |
| এলএনজি সরবরাহ | বিঘ্নিত | কাতার এনার্জির ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা |
| দেশের বাজারে প্রভাব | তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সংকট | পেট্রোল পাম্পে জোগানজনিত চাপ, সার কারখানার উৎপাদন স্থগিত |
সরকার ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা বৃদ্ধি পাবে, যা খাদ্য ও উৎপাদন খাতেও চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং বাজেট ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “জ্বালানি তেলের সংকট সব শ্রেণির মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নতুন সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বিনিয়োগ স্থগিত হতে পারে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা তৈরি হবে।”
বাংলাদেশের জন্য একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
