মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের দামে নতুন উল্লম্ফন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কৌশলগত সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে আংশিকভাবে নৌযান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল সাময়িক বাজার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ভোরে এশীয় বাজারে লেনদেন শুরু হতেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছায়, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ০.৮৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দাম এক শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে জ্বালানি খাতে ঝুঁকছেন, যার ফলেই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও লেবানন ও আশপাশের অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলছে।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে সামান্য বিঘ্নও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, বীমা প্রিমিয়াম এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা খরচও বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের তেল উৎপাদন সাম্প্রতিক হামলার কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ব্যারেল উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনও দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

নিচে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—

সূচকপরিমাণ/অবস্থা
ব্রেন্ট ক্রুড মূল্য৯৬.৭৫ ডলার/ব্যারেল
মূল্য বৃদ্ধিপ্রায় ০.৮৭%
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড মূল্য বৃদ্ধি১% এর বেশি
সৌদি উৎপাদন হ্রাস৬ লাখ ব্যারেল/দিন
পাইপলাইন পরিবহন হ্রাস৭ লাখ ব্যারেল/দিন
হরমুজ প্রণালির অংশীদারিত্ববৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০%

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো—বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো—বড় ধরনের চাপে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর ছাপ ফেলতে পারে।