মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার ফলে দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনই জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। হাতেগোনা যে কয়েকটি পাম্প চালু আছে, সেগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে।
পাম্পগুলোর বর্তমান চিত্র ও সরবরাহ ঘাটতি
রাজধানীর মগবাজার, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও এবং মতিঝিল এলাকা ঘুরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ সংবলিত সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। মগবাজারের মহিন মোটরস ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে অনেক চালককে। সেখানকার কর্মীরা জানিয়েছেন, গত শনিবারের পর ডিপো থেকে নতুন করে কোনো সরবরাহ না আসায় তারা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। একই চিত্র দেখা গেছে মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্সে, যেখানে দৈনিক ৩০ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৩ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
নিচে রাজধানীর প্রধান কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| ফিলিং স্টেশনের নাম | অবস্থান | বর্তমান অবস্থা | কারণ/মন্তব্য |
| মহিন মোটরস | মগবাজার | সম্পূর্ণ বন্ধ | গত দুই দিন ধরে ডিপো থেকে সরবরাহ নেই। |
| পূর্বাচল ট্রেডার্স | পরীবাগ | বন্ধ (অকটেন ও পেট্রোল নেই) | পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হয়নি। |
| কারিম অ্যান্ড সন্স | মতিঝিল | বন্ধ (সাময়িকভাবে) | চাহিদার তুলনায় ৫০ শতাংশের কম সরবরাহ। |
| বিনিময় ফিলিং স্টেশন | দৈনিক বাংলা | আংশিক বন্ধ | শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, অকটেন শেষ। |
| মেঘনা মডেল সার্ভিসিং | পরীবাগ | চালু | দীর্ঘ লাইন ও ধীরগতিতে সরবরাহ। |
সংকটের মূল কারণ: বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলার সূত্র ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইরান বিশ্বের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো ঝুঁকিতে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।
এই আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটার প্রবণতা শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে তেলের দাম আরও বাড়ার বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার ভয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন। ফলে খুচরা পর্যায়ে চাহিদার একটি কৃত্রিম উল্লম্ফন তৈরি হয়েছে, যা সরকারের বিদ্যমান মজুতের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার এই আকস্মিক বৃদ্ধি সামাল দেওয়া ডিলারদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনজীবনে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
জ্বালানি সংকটের কারণে গণপরিবহন চলাচল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ ও ভোগান্তি উভয়ই বাড়বে। পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, যদি দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তবে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলও ব্যাহত হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধন এবং মজুত ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
