মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র বর্তমানে এক ভয়াবহ অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত পঞ্চম দিনে পা দিয়ে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ইরান এবং লেবাননে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা যেমন তীব্রতর হয়েছে, তেমনি তেহরানের পক্ষ থেকে ধেয়ে আসা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় থরথর করে কাঁপছে পুরো অঞ্চল। পরিস্থিতি এখন আর কেবল নির্দিষ্ট দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ১২টি দেশে এই যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে।
Table of Contents
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান
গত বুধবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলার লক্ষ্যবস্তু এক দিনেই দ্বিগুণ করেছে। যেখানে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১,০৩৯টি হামলার কথা বলা হয়েছিল, বুধবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজারে। রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, কোম ও উরমিয়া প্রদেশে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে জনজীবন বিপর্যস্ত। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-র মতে, নিহতদের মধ্যে একটি বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে ১৮১ জন শিশুর বয়স ১০ বছরের নিচে।
সামরিক অভিযানের বিস্তৃতি ও পাল্টা আঘাত
যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, দুটি বিশাল বিমানবাহী রণতরি এবং অত্যাধুনিক বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। তবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা মার্কিন সামরিক শক্তির হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটে ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে, যা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধের বর্তমান চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতি একনজরে
নিচে চলমান যুদ্ধের প্রধান প্রধান ঘটনাবলি ও ক্ষয়ক্ষতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| যুদ্ধের ক্ষেত্র | প্রধান ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি | বিশেষ মন্তব্য |
| ইরান | ১,০৪৫+ নিহতের দাবি (রাষ্ট্রীয় মাধ্যম)। ২,০০০ স্থাপনায় মার্কিন হামলা। | রাজধানী তেহরানে সবচেয়ে বেশি বিস্ফোরণ। |
| লেবানন | ইসরায়েলি স্থলবাহিনী সীমান্ত থেকে ৬ কিমি ভেতরে। ৭২ জন নিহত। | খিয়াম শহরে হিজবুল্লাহর সাথে তীব্র লড়াই। |
| মার্কিন স্থাপনা | কাতারের আল-উদেইদ ও দুবাই কনস্যুলেটে হামলা। | মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি মার্কিন স্থাপনায় ইরানের আঘাত। |
| নৌপথ | শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিনের হামলা। | ৮৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। |
| অর্থনৈতিক প্রভাব | সৌদি আরবের তেল শোধনাগার রাস তানুরায় হামলা। | বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার আশঙ্কা। |
কৌশলগত বিতর্ক ও স্থল অভিযানের সম্ভাবনা
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরানের আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রয়োজনে স্থল অভিযানেও যেতে পারে তারা। তবে বিশ্লেষকরা একে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ বলে সতর্ক করছেন। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক ক্রিস্টোফার প্রেবল মনে করেন, ইরান ইরাকের চেয়ে আয়তনে কয়েক গুণ বড় এবং দেশটির ভৌগোলিক ও সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জের হবে।
এদিকে, অভ্যন্তরীণভাবেও ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাটদের তোপের মুখে পড়েছে। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ এবং ‘মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে শুরু করা’ বলে অভিহিত করেছেন। বিপরীতে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার প্রতিশোধ হিসেবে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
রাশিয়া, চীন এবং কানাডার মতো দেশগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, তেহরানের ওপর এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী আলিজাদেহর মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরান কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কারণ ইরানের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কয়েক গুণ বেশি দামি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের অর্থনীতিতে ধস নামাতে পারে।
বর্তমানে ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ পরবর্তী শোক পালন করছে। তবে ইসরায়েলি নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি এবং ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই রণক্ষেত্র শিগগিরই শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রলয় শেষ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
