মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন তেল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঝুঁকিতে, হুঁশিয়ারি ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে নতুন করে সংঘাতের হুমকি উচ্চারণ করেছে ইরান। দেশটির জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় কোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর পাল্টা আঘাত হানার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইউনিফাইড কমব্যাট্যান্ট কমান্ডের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যমগুলো জানায়, নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত।

এই হুঁশিয়ারি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার একটি আল্টিমেটাম দিয়ে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। অন্যথায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় সামরিক হামলার হুমকি দেন তিনি। এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়েছে।

সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে এক হাজারেরও বেশি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে, যার অধিকাংশই তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে এবং বহু দেশ বিকল্প সরবরাহ পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।

পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মাত্র দুই মাইল প্রশস্ত দুটি নৌপথ দিয়ে পরিচালিত এই সরু করিডরটি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

নিচে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

সূচকতথ্য
অবস্থানপারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল
দৈনিক জ্বালানি পরিবহনবিশ্ব তেলের প্রায় ২০-২৫%
এলএনজি পরিবহনবিশ্ব সরবরাহের বড় অংশ
নৌপথের প্রস্থআনুমানিক ২ মাইল (দুটি লেন)
আটকা পড়া জাহাজ১০০০+

ইরানের সামরিক কমান্ড স্পষ্ট করেছে যে তারা শুধু আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ বা জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি তেলক্ষেত্র, শোধনাগার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক জ্বালানি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্বের প্রধান তেল আমদানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যে বিকল্প রুট খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে হরমুজ প্রণালীর সমপর্যায়ের কোনো বিকল্প না থাকায় তারা কার্যত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। ইরানও বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এই উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক গভীর অনিশ্চয়তার সংকেত বহন করছে।