মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এক সপ্তাহ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এক সপ্তাহ অতিক্রম করেছে। তেহরান ও তেল আবিবকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলায় হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম স্থবির হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তীব্র করছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য শহরে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, হাইফার সামরিক স্থাপনা ও শহরের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে উন্নত প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা ঘোষণা করে। তবে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা পুরোপুরি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়নি।

ইরান একই সঙ্গে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছে। কুয়েতে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হয়েছে; এর আগে দুই বাংলাদেশি মারা গিয়েছেন। কাতারের এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, “যারা ইরানি জনগণকে অবমূল্যায়ন করেছে, তাদের উদ্দেশে কোনো মধ্যস্থতা হওয়া উচিত।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বেসামরিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বা ইসরায়েলি জাহাজ লক্ষ্যবস্তু হবে।

ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত একদিনে ১৪০ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। সামগ্রিকভাবে যুদ্ধের প্রথম সাত দিনে ইরানে নিহত হয়েছেন ১,৩৩২ জন, আহত ২,০০০-এর বেশি। আহতদের মধ্যে রয়েছে চার মাস বয়সী শিশু ও ৯৪ বছর বয়সী প্রবীণ।

রেড ক্রিসেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:

ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাসংখ্যা
আবাসিক ভবন৩,০৯০
বাণিজ্যিক/সেবা কেন্দ্র৫২৮
চিকিৎসা কেন্দ্র/ওষুধ কারখানা১৪
রেড ক্রিসেন্ট স্থাপনা
মোট৩,৬৪৩

সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা হেগসেথ ও ব্র্যাড কুপার। ট্রাম্প দাবি করেছেন, “ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে” এবং সেনা পাঠানো এখন সময়ের অপচয়।

লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, এতে অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলও বিমান হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে।

বিশ্ব নেতারা সংঘাত স্থায়ী না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস জানিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। স্পেন ও পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রীও যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করেছেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়ে জানিয়েছেন, ইরানি জাহাজ আইআরআইএস বুশেহরের ২০৮ ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে শত শত তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ আটকে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব মারাত্মক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তীব্র হচ্ছে। সংঘাত কেবল সামরিক নয়, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক জলপথ ও মানবাধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে গ্লোবাল সংকট সৃষ্টি করেছে।

যুদ্ধের প্রভাব এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রতিদিন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায় সতর্ক। আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি চলতে পারে।