এবিএম জাকিরুল হক টিটন
নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে নাগরিক স্বাধীনতার অবস্থানে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে—তুচ্ছ অভিযোগ, মতপ্রকাশ, প্রশ্ন তোলা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে হাজার হাজার মানুষ কারাগারে বন্দি। এদের বড় অংশই ক্ষমতাহীন সাধারণ নাগরিক; রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় তাদের পক্ষে নেই জোরালো প্রতিবাদ, নেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের ধারাবাহিকতা। ফলে একটি নীরব কিন্তু গভীর মানবিক সংকট গড়ে উঠেছে।
Table of Contents
প্রশ্ন করাই কি অপরাধ?
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানের ঘটনা এ সংকটের প্রতীক। কোনো সহিংসতা, ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়েও তিনি কেবল একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বদলে তাঁকে দীর্ঘদিন জামিনহীনভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিচারকদের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপ ও সামাজিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে জামিন শুনানি করতেও সংকোচ বোধ করেন। এটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বিচার ব্যবস্থায় ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তারের ইঙ্গিত।
জনপ্রিয়তা কি অপরাধ?
ব্যারিস্টার সুমনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চিত্র। তিনি কোনো দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত নন; স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়ে আইনি সচেতনতা ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। অথচ তুচ্ছ অভিযোগে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি রাখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—আইনি অপরাধ নাকি রাজনৈতিক অস্বস্তি—কোনটি তাঁর আসল ‘দোষ’?
অবস্থান বদলালেই কারাগার
আনিস আলমগীর একসময় একটি আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের সমালোচনা করায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকী ছবি শেয়ার করাই হয়ে ওঠে অভিযোগের ভিত্তি। এতে স্পষ্ট—সমস্যা অপরাধে নয়; সমস্যাটি ভিন্নমত ও অবস্থান বদলের সাহসে।
বিচারালয়: শেষ আশ্রয়ের সংকট
সংবিধান ব্যক্তিস্বাধীনতা, জামিনের নীতি এবং বিচারবহির্ভূত আটককে অবৈধ ঘোষণা করলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র—দীর্ঘসূত্রতা, জামিন অস্বীকৃতি, বিচার শুরুর আগেই কার্যত শাস্তির মতো কারাবাস। ফলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নিচের সারণিতে বর্তমান পরিস্থিতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | সংবিধানিক নীতি | বাস্তব চিত্র |
|---|---|---|
| ব্যক্তিস্বাধীনতা | সুরক্ষিত | দীর্ঘ কারাবাস |
| জামিন | নিয়ম, ব্যতিক্রম নয় | প্রায়শ অস্বীকৃত |
| মতপ্রকাশ | অধিকার | মামলার ঝুঁকি |
| বিচারকের স্বাধীনতা | নিশ্চিত করার কথা | চাপ ও ভয়ের অভিযোগ |
নীরব বিশ্ব, বাড়তে থাকা সংকট
আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতাও উদ্বেগজনক। নিয়মিত ও উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ না থাকায় রাষ্ট্রীয় আচরণ আরও কঠোর হয়ে উঠছে, আর কারাগার ভরে উঠছে নিরপরাধ নাগরিকে।
ভোটের আগে ন্যূনতম করণীয়
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে জরুরি—
মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক মামলায় আটক নিরপরাধদের মুক্তি
জামিনযোগ্য মামলায় অবিলম্বে জামিন
বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত না করা
এটি কোনো দলীয় দাবি নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষার মৌলিক শর্ত। কারাগারে বন্দি মানুষ নয়, ভয়মুক্ত নাগরিকই পারে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে। অন্যথায় ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে—যখন সত্য কারাগারে বন্দি হয়, তখন রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়।