বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলায় একটি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আত্মহত্যার দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রাজ মন্ডল জয় নামে এক দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর আগে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের পশ্চিম সুজনকাঠী গ্রামে কিশোরের নিজ বাসভবনে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
কিশোরের পরিচয় ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
নিহত রাজ মন্ডল জয় (১৬) গৈলা ইউনিয়নের পশ্চিম সুজনকাঠী গ্রামের বাসিন্দা হরষিত মন্ডলের জ্যেষ্ঠ পুত্র। সে উপজেলা সদরের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভেগাই হালদার পাবলিক একাডেমির দশম শ্রেণির নিয়মিত ছাত্র ছিল। জয় পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয় ছিল। সে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিনোদনমূলক ও রোমাঞ্চকর ছোট ভিডিও (টিকটক) তৈরি করে ইন্টারনেটে আপলোড করত, যেখানে তার অনেক অনুসারীও ছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় জয় বাড়ির দ্বিতীয় তলার নিজ কক্ষে নতুন একটি ভিডিও তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে সময় সে একটি আত্মহত্যার অভিনয়ের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে নিজের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে সিলিংয়ের আড়ার সাথে ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করে। দুর্ভাগ্যবশত, অভিনয়ের এক পর্যায়ে ওড়নাটি গলায় শক্ত হয়ে আটকে যায় এবং পা ফসকে সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ফলে ঝুলে থাকা অবস্থায় শ্বাসরোধ হয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার মৃত্যু হয়।
মামলার তথ্য ও ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ সারাংশ
পরিবারের আহাজারি ও শোকাতুর পরিবেশ
জয়ের ছোট বোন নুপুর মন্ডল জানায়, সন্ধ্যায় গৃহশিক্ষক পড়াতে আসবেন বলে সে তার ভাইকে ডাকতে গিয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে এবং কোনো সাড়া না পেয়ে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরে পরিবারের বড়দের খবর দিলে তাঁরা দরজা খুলে জয়ের ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাছরিন জাহান নিশা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জয়ের মা স্মৃতি মন্ডল শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তিনি বিলাপ করতে করতে বলেন যে, তাঁর একমাত্র সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে এই সর্বনাশা ডিজিটাল নেশা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে বলেন, “দেশ থেকে এই সব ক্ষতিকর অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে ডিজিটাল ভিডিওর কারণে খালি না হয়।” জয়ের অকাল প্রয়াণে পুরো গ্রামজুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে।
পুলিশি তদন্ত ও সামাজিক সচেতনতা
খবর পেয়ে আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং মরদেহ থানায় নিয়ে আসেন। প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি কোনো পরিকল্পিত আত্মহত্যা নয় বরং ভিডিও তৈরির সময় ঘটে যাওয়া একটি নিছক দুর্ঘটনা। উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক সাংবাদিকদের জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার নেশায় কিশোর-কিশোরীরা এখন জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি সৎকারের জন্য স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ এই বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা নথিভুক্ত করেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রশাসন অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন যেন তাঁরা তাঁদের সন্তানদের মুঠোফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখেন। বিশেষ করে এই ধরনের বিপজ্জনক ভিডিও তৈরির সংস্কৃতি থেকে শিশু-কিশোরদের দূরে রাখা এখন সময়ের দাবি।
