রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির চালের কার্ড বিতরণকে কেন্দ্র করে নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আজাদ আলী সরদার (৬২) মারধরের শিকার হয়েছেন। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর অভিযোগে বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে।
আহত আজাদ আলী সরদার নওপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর নান্দিগ্রাম ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হামলার পর তাকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার বুক, পিঠ ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যাওয়ার পথে শ্যামপুর গ্রামে কয়েকজন ব্যক্তি তার পথরোধ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আফাজসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেদের অনুসারীদের জন্য ২৪০টি ভিজিএফ কার্ড দাবি করেন।
চেয়ারম্যান আজাদ আলী সরদার অভিযোগ করেছেন, তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষের তালিকা তৈরি করে কার্ড বিতরণ করার কথা বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্তরা তাকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি মারধর করেন এবং তার সঙ্গে থাকা কিছু দাপ্তরিক কাগজপত্র ছিনিয়ে নেন। তিনি বলেন, “আমি নিয়ম মেনে কার্ড বিতরণের কথা বলেছিলাম। কিন্তু তারা জোর করে নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্ড দাবি করেন। আমি রাজি না হওয়ায় আমাকে মারধর করা হয়।” তিনি তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি করার অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে হামলার ঘটনা আংশিকভাবে স্বীকার করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য ও শ্যামপুর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল ইসলাম। তবে তার দাবি, ভিজিএফ কার্ড দেওয়ার বিনিময়ে চেয়ারম্যান পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। শ্যামপুর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিমের দাবি, প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকা না করে চেয়ারম্যান নিজের পছন্দমতো তালিকা তৈরি করছিলেন। স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধ থেকেই এই হামলা সংঘটিত হয়েছে।
ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের সংক্ষিপ্ত তথ্য
| নাম | বয়স | পরিচয় | অভিযোগ বা অবস্থান |
|---|---|---|---|
| আজাদ আলী সরদার | ৬২ | ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, নওপাড়া ইউনিয়ন | হামলার শিকার |
| রেজাউল ইসলাম | অজানা | সাবেক ইউপি সদস্য, বিএনপি নেতা | হামলা স্বীকার, পাল্টা অভিযোগ |
| আফাজ | অজানা | স্থানীয় বিএনপি নেতা | পথরোধ ও হামলার অভিযোগ |
| আব্দুল হাকিম | অজানা | বিএনপি নেতা | স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধের দাবি |
ভিজিএফ কর্মসূচি মূলত সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প। এর মাধ্যমে বিশেষ করে ঈদ ও অন্যান্য উৎসবে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারদের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়। সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করে এবং সেই তালিকা অনুযায়ী কার্ড বিতরণ করা হয়।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, হামলার ঘটনায় চেয়ারম্যান লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিনা জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বিতরণে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত প্রায়ই দেখা যায়, যার ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হন। তাই এ ধরনের কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
এই ঘটনা স্থানীয় সমাজে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং ভিজিএফ কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
