শ্রীলঙ্কা উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দিনা’ (IRIS Dena) ডুবে যাওয়ার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ধ্বংস হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেই এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতের বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত একটি মেগা নৌ মহড়ায় ‘অতিথি’ হিসেবে অংশ নিয়েছিল। ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটা এই ঘটনাটি এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার বিবরণ ও উদ্ধার অভিযান
গত বুধবার শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে কিছুটা দূরে ভারত মহাসাগরের গভীর জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় ইরানি যুদ্ধজাহাজটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন থেকে সরাসরি আক্রমণে কোনো যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা আধুনিক সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা জাহাজটি থেকে একটি জরুরি বিপৎসংকেত পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও সেখানে কোনো জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। সমুদ্রের উপরিভাগে কেবল তেলের আস্তরণ এবং ভাসমান নাবিকদের দেখা গেছে।
একনজরে আইআরআইএস দিনা ও হামলার ক্ষয়ক্ষতি
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| জাহাজের নাম | আইআরআইএস দিনা (IRIS Dena) |
| আক্রমণকারী | মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন |
| আক্রমণের স্থান | ভারত মহাসাগর (শ্রীলঙ্কার গলে উপকূলের কাছে) |
| নিহত নাবিক | ৮৭ জন (মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে) |
| জীবিত উদ্ধার | ৩২ জন (শ্রীলঙ্কায় চিকিৎসাধীন) |
| নিখোঁজ/মোট | আনুমানিক ১৩০ জন নাবিক জাহাজে ছিলেন |
| পূর্ববর্তী কার্যক্রম | ভারতের ‘এমআইএলএএন ২০২৬’ মহড়ায় অংশগ্রহণ |
ভারতের মহড়ায় অংশগ্রহণ ও কূটনৈতিক বিতর্ক
নয়াদিল্লি নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজটি গত ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশাখাপত্তনমে অনুষ্ঠিত বহুজাতিক নৌ মহড়া ‘এমআইএলএএন ২০২৬’-এ অংশ নিয়েছিল। ৭৪টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মহড়ায় ইরানকে ভারতের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে প্রকাশিত ছবিতে জাহাজটিকে সগৌরবে ভাসতে দেখা গিয়েছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, ভারতের ‘অতিথি’ হিসেবে মহড়া শেষ করে ফেরার পথেই মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই হামলা চালিয়েছে। তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানানোয় দেশের অভ্যন্তরেও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, সংঘাত এখন ভারতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে, অথচ সরকারের নীরবতা রহস্যজনক। অন্যদিকে, সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের আমন্ত্রণে আসা একটি জাহাজে ভারতের জলসীমার এত কাছে হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করার নামান্তর।
মার্কিন ও ইরানি অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই হামলাকে একটি ‘সফল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, ইরানি নৌবাহিনীকে নির্মূল করাই বর্তমানে তাদের সামরিক লক্ষ্য। অন্যদিকে, ইরান এই ঘটনাকে ‘নৃশংসতা’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চরম অনুশোচনা’ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এই ঘটনা ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে নতুন এক সমীকরণে ফেলে দিয়েছে, যেখানে ভারতের কৌশলগত অবস্থান এখন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন।
