দক্ষিণ এশিয়ার চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বৈরী সম্পর্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরগুলোতে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ভারতে অনুষ্ঠিতব্য আগামী দুটি বড় টুর্নামেন্ট বিকল্প ভেন্যু হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
Table of Contents
ভেন্যু পরিবর্তনের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট
বর্তমানে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এই টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করেই মূলত সংকটের সূত্রপাত। নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশ সরকার তাদের জাতীয় ক্রিকেট দলকে ভারতে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং সরকারের পক্ষ থেকে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ করা হলেও আইসিসি তা নাকচ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পাকিস্তান সরকার ভারতের বিপক্ষে যেকোনো ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিলে আইসিসি চরম বিপাকে পড়ে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান স্বয়ং লাহোর সফর করেন এবং পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আলোচনার পর পাকিস্তান সরকার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করলে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় ভারত-পাকিস্তান হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন আইসিসিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ঝুঁকির মুখে থাকা টুর্নামেন্টসমূহ
আইসিসির ভবিষ্যৎ সফর পরিকল্পনা (FTP) অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে ভারতে একাধিক আইসিসি ইভেন্ট হওয়ার কথা রয়েছে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের সূত্রমতে, ২০২৯ এবং ২০৩১ সালের টুর্নামেন্টগুলোই মূলত অস্ট্রেলিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার তালিকায় রয়েছে।
ঝুঁকির মুখে থাকা টুর্নামেন্টের তালিকা একনজরে:
| টুর্নামেন্টের নাম | নির্ধারিত সাল | বর্তমান নির্ধারিত আয়োজক | সম্ভাব্য বিকল্প ভেন্যু |
| আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি | ২০২৯ | ভারত | অস্ট্রেলিয়া |
| আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ | ২০৩১ | ভারত ও বাংলাদেশ | অস্ট্রেলিয়া / নিউজিল্যান্ড |
| আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ | ২০২৮ | অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড | (অপরিবর্তিত) |
কেন বিকল্প ভেন্যু হিসেবে অস্ট্রেলিয়া?
অস্ট্রেলিয়াকে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ এবং শক্তিশালী অবকাঠামোর দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৮ সালে সেখানে এমনিতেই একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আইসিসির নীতিনির্ধারকদের মতে, রাজনৈতিক কারণে যদি কোনো দেশ নির্দিষ্ট কোনো ভেন্যুতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক মূল্য এবং সম্প্রচার স্বত্বের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভারত বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনৈতিক শক্তি হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা বৈশ্বিক আসরগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইসিসি চায় এমন একটি নিরপেক্ষ এবং স্থিতিশীল পরিবেশ, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক ছাড়াই সব দেশ অংশ নিতে পারবে। এই মাপকাঠিতে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড বর্তমানে আইসিসির পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও ক্রিকেটের সংকট
২০৩১ সালের বিশ্বকাপে ভারতের সাথে সহ-আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। যদি টুর্নামেন্টটি ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের আয়োজক স্বত্বও ঝুঁকির মুখে পড়বে কিনা—তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভারত-পাকিস্তান এবং ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক উত্তেজনার সমাধান না হয়, তবে আইসিসি বড় আর্থিক ক্ষতি এড়াতে শেষ পর্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবে না।
খেলাধুলা এবং রাজনীতিকে আলাদা রাখার কথা বারবার বলা হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় তা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিসির এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এক বিশাল প্রশাসনিক এবং ভৌগোলিক পরিবর্তন।
