ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিমা পণ্যের বিক্রিতে অনিয়মের সত্যিকারের পরিমাণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। সাধারণ পরিবারগুলো কিভাবে এর শিকার হচ্ছে, এবং কেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দীর্ঘ বছর এ সমস্যার দিকে নজর দেয়নি—এসবই এবার আলোকপাতের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
গত কয়েক দশক ধরে ভারতের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে একটি নীরব আর্থিক কেলেঙ্কারি চলেছে। বিষয়টি রেগুলেটররা জানতেন, তবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সমস্যার প্রকৃতি বোঝা যায় তখনই, যখন এটি সরাসরি কারো ঘরে প্রবেশ করে এবং স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে।
কলকাতার দক্ষিণের ঠাকুরপুকুর এলাকায় একটি তিন বেডরুমের সাধারণ বাসায় মীরা দাস (নাম পরিবর্তিত) জানালেন, কীভাবে তাঁরা স্বামীর সঙ্গে দুটি বিমা পণ্য ক্রয় করেছিলেন, যা তাদের জন্য উপযুক্ত ছিল না। আজ তাদের ১২ লাখ টাকা সঞ্চয় এমন পণ্যে আটকা পড়ে আছে, যা তাঁরা বোঝার সুযোগও পাননি।
মীরা স্মরণ করলেন, সবকিছু জটিল হতে শুরু করেছিল জানুয়ারি ২০২৩ থেকে। তিনি সম্প্রতি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, এবং স্বামীও ৬০ বছর বয়সে অবসরগ্রহণ করেছিলেন। অর্থনৈতিকভাবে সাবধান ও শান্ত জীবনের আশা নিয়ে তারা দিন শুরু করেছিলেন।
তাঁর স্বামী প্রথমে স্থানীয় স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI) শাখায় গিয়েছিলেন অবসর সুবিধার অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন তা জানতে। মীরা তখন অসুস্থ ছিলেন। সম্ভবত এজন্যই শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক একদিন তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন।
“তিনি পলিসি সম্পর্কে বোঝালেন, কিন্তু আমি কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। আমরা কেবল তাঁর কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি,” মীরা বললেন। তিনি ভাবেছিলেন এটি একটি সুরক্ষিত ফিক্সড ডিপোজিটের মতো পণ্য। স্বামী দ্বিতীয় পণ্যের বিষয়ে কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করলেও, ব্যাংক কর্মকর্তা আশ্বাস দেন যে অবসরভাতা অ্যাকাউন্টে জমা হলে কিস্তি পরিশোধে কোনও সমস্যা হবে না।
একজন অভিজ্ঞ প্রাইভেট-সেক্টর ব্যাংকার, দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে, নাম গোপন রাখার শর্তে জানালেন, “যখন একজন কাস্টমারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়, তারা কাগজপত্র পড়া বন্ধ করে দেয়। দুই-তিন বছর ধরে আমি আপনার রিলেশনশিপ ম্যানেজার হয়ে থাকলে, আপনি যা বলি তা গ্রহণ করেন।”
বিমা বিক্রির প্রভাব ও উদাহরণ
| নাম | বয়স | অবসর বছর | বিনিয়োগের ধরন | সঞ্চয় আটকা (টাকা) | সমস্যা মূল কারণ |
|---|---|---|---|---|---|
| মীরা দাস | 60 | 2023 | দুই বিমা পণ্য | 12,00,000 | বিক্রেতার আশ্বাসে অজ্ঞতা |
| অনুরাগ শর্মা | 58 | 2022 | ULIP পলিসি | 8,50,000 | বিনিয়োগের ঝুঁকি বোঝা হয়নি |
| রাধা মেহতা | 62 | 2021 | পেনশন প্ল্যান | 15,00,000 | কাগজপত্র পড়ার সুযোগ পাননি |
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। গ্রাহকরা সাধারণত ব্যাংক বা বিমা কর্মকর্তার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন এবং কাগজপত্রের বিস্তারিত পড়েন না। এতে অনেকেই তাদের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিপুল সমস্যার সম্মুখীন হন।
ভারতের বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, IRDAI, যদিও অনিয়মের কথা জানে, কার্যকর নজরদারি বহু বছর ধরে কম ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রাহক শিক্ষার অভাব এবং বিক্রেতাদের অতিরিক্ত প্রণোদনা এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
মীরার অভিজ্ঞতা শুধু একটি উদাহরণ। এ ধরনের ঘটনা দেশের বহু সাধারণ পরিবারে ঘটছে, যা ক্রমশ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আরও কেউ এই ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।
এই সংবাদ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হওয়ার আগে সতর্কতা নেওয়া অতীব জরুরি।
