ভয়াবহ তুষারঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ জনের মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভয়াবহ শীতপ্রবাহ ও তীব্র তুষারঝড় জনজীবনে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তুষারঝড়ের প্রভাবে হাজারো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ, এবং অন্তত ২৫টি অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।

শীতের এই প্রবল তাণ্ডব যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর–পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। নিউইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাসসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভারী তুষারপাত হয়েছে, কোথাও কোথাও ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষার জমেছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, যা স্বাভাবিক জনজীবনকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগের সরাসরি প্রভাবে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, আর সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে ১৫ কোটিরও বেশি নাগরিককে।

দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে, যেখানে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানি নাগরিকদের জরুরি সহায়তার প্রয়োজনে দ্রুত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া টেনেসি, লুইজিয়ানা, টেক্সাস, ম্যাসাচুসেটস ও কানসাস থেকেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যেখানে দুর্ঘটনা, শীতজনিত অসুস্থতা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটজনিত নানা ঝুঁকিতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

তুষারঝড়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। গত রোববার দেশজুড়ে ১১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়, এবং পরবর্তী দিনগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে। বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে যাত্রা স্থগিত বা বাতিল হওয়ায় ভ্রমণ পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি, মহাসড়ক ও স্থানীয় সড়কগুলো বরফে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বহু এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং উদ্ধার কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও তুষারঝড়ের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে। টেক্সাস থেকে ভার্জিনিয়া পর্যন্ত অন্তত ৮ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় তীব্র ঠান্ডার কারণে গরম রাখার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ফলে বৃদ্ধ, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে এবং জরুরি সহায়তা সরবরাহের চেষ্টা করছে।

জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তুষারঝড়ের মূল বলয় উত্তর–পূর্বাঞ্চল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে সরে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চল থেকে আরও ঠান্ডা বাতাস প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন যে, উত্তর–পূর্বাঞ্চলে আরও ভারী তুষারপাত ও বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং তীব্র শীত আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। ফলে জরুরি পরিষেবা সংস্থাগুলোকে উচ্চমাত্রার প্রস্তুতি রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিচের সারণিতে তুষারঝড়ের প্রধান প্রভাবসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

বিষয়পরিসংখ্যান/তথ্য
মোট প্রাণহানিঅন্তত ৩০ জন
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গরাজ্যনিউইয়র্ক (৫ জন মৃত্যু)
তুষারপাতের পরিমাণসর্বোচ্চ ১৮ ইঞ্চি
সর্বনিম্ন তাপমাত্রামাইনাস ১৮°C
ঝুঁকির মধ্যে জনসংখ্যাপ্রায় ১১.৮ কোটি মানুষ
সতর্ক অবস্থায় জনসংখ্যা১৫ কোটির বেশি
বাতিল হওয়া ফ্লাইট১১,০০০+
বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন গ্রাহক৮,২০,০০০+
জরুরি অবস্থা জারিঅন্তত ২৫ অঙ্গরাজ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন চরম আবহাওয়া ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। তাই অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।