ব্যালট পেপার ফটোকপি করে বিতরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩

জয়পুরহাট-২ আসনের নির্বাচনী পরিবেশে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে ব্যালট পেপার ফটোকপি করার এক নজিরবিহীন ঘটনায়। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জেলার কালাই উপজেলার মাত্রাই বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। সরকারি ব্যালট পেপারের আদলে ফটোকপি তৈরি করে তা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বিতরণের অভিযোগে একটি ফটোকপি দোকানের মালিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এটি একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যৌথ বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তার

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল এবং কালাই থানা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী বুধবার সন্ধ্যায় মাত্রাই বাজারের একটি ফটোকপি দোকানে হানা দেয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরেই ওই দোকানে অত্যন্ত গোপনে সরকারি ব্যালট পেপারের অবিকল ফটোকপি তৈরি করা হচ্ছিল। তল্লাশি চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুল পরিমাণ ফটোকপি করা ব্যালট পেপার এবং তা তৈরির সরঞ্জামাদি জব্দ করে।

আটককৃত ব্যক্তিরা হলেন—দোকানের স্বত্বাধিকারী নির্মল চন্দ্র সরকার (৫১) এবং তাঁর দুই সহযোগী জহুরুল ইসলাম (২৬) ও মোস্তাফিজুর রহমান (৩০)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দোকান মালিক স্বীকার করেছেন যে, তিনি এ পর্যন্ত মোট ২৭২টি ব্যালট পেপারের ফটোকপি তৈরি করেছেন। কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টায় এটি একটি অপরাধমূলক পদক্ষেপ।


ঘটনার মূল তথ্যচিত্র

বিষয়বিস্তারিত বিবরণ
নির্বাচনী এলাকাজয়পুরহাট-২ (কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর)
ঘটনাস্থলমাত্রাই বাজার, কালাই উপজেলা
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিনির্মল চন্দ্র সরকার, জহুরুল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান
অভিযোগের প্রকৃতিসরকারি ব্যালট পেপারের অবিকল ফটোকপি প্রস্তুত ও বিতরণ
জব্দকৃত আলামত২৭২টি ফটোকপি করা ব্যালট পেপার
অভিযান পরিচালনাকারীসেনাবাহিনী ও পুলিশ (যৌথ বাহিনী)
আইনি পদক্ষেপআদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণের প্রস্তুতি

পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

গ্রেপ্তারের ঘটনায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের একটি অংশ দাবি করছে, ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং ভোট যেন বাতিল না হয়, সে উদ্দেশ্যে তারা নমুনা ব্যালট (Dummy Ballot) হিসেবে এগুলো ব্যবহার করছিল। তাদের মতে, বয়স্ক ভোটারদের ভোট দেওয়ার নিয়ম শেখানোর জন্য এটি একটি সাধারণ প্রক্রিয়া এবং এতে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই যুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ব্যালট পেপার কোনো সাধারণ নথি নয় এবং এর হুবহু ফটোকপি তৈরি করা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি জালিয়াতির সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে রাতে ভোটকেন্দ্রে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই ফটোকপিগুলো স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মাঝে বিতরণ করার পরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনি ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা

কালাই থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁদের জয়পুরহাট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের পবিত্রতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। কাউকে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা রিউমার ছড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।”

বর্তমানে কালাই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশ ও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। ব্যালট পেপার ফটোকপি করার এই ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো বড় চক্র বা প্রভাবশালী কেউ জড়িত কি না, তা বের করতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।