ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ৫৬ শতাংশ যাত্রীর জোরালো সমর্থন

রাজধানী ঢাকার রাজপথে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত আধিপত্য জনজীবনে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি তৈরি করছে। সম্প্রতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভিশন’ পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সাধারণ যাত্রীদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬.৬০ শতাংশ) এই বাহনটিকে কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার পক্ষে। আজ রোববার কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়, যেখানে ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় রিকশার বিবর্তন ও এর নানাবিধ প্রভাব ফুটে উঠেছে।

জনমতের প্রতিফলন ও নিরাপত্তার শঙ্কা

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে নগরবাসীর মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। প্রায় ২১.৯০ শতাংশ যাত্রী এটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যাতায়াতের সুবিধার কথা চিন্তা করে ৩৩.৯৩ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, এই বাহনটি কেবল পাড়া-মহল্লার গলির রাস্তায় সীমিত রাখা উচিত। যদিও ৮২ শতাংশ যাত্রী দ্রুত যাতায়াতের জন্য এটি ব্যবহার করেন, তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে ৩০ শতাংশ যাত্রীই জানিয়েছেন যে, ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর বিপরীতে প্যাডেল রিকশায় এই ঝুঁকির হার মাত্র ১৮ শতাংশ।

নিবন্ধনের অভাব ও যানজটের কারণ

গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী সিংহভাগ রিকশাই অবৈধ। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭.৪ শতাংশেরই কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই। এই বিশাল সংখ্যক অনিবন্ধিত যানবাহন রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে নাজুক করে তুলছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৬২ শতাংশ মানুষের মতে, শহরে যানজট বৃদ্ধির পেছনে ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

ব্যাটারিচালিত ও প্যাডেল রিকশার মধ্যে তুলনামূলক চিত্র:

মানদণ্ড ও পরিসংখ্যানব্যাটারিচালিত রিকশাপ্যাডেলচালিত রিকশা
নিবন্ধনহীন যানবাহনের হার৯৭.৪%৮৫.৯৪%
দুর্ঘটনার আশঙ্কাবোধ (যাত্রী)৩০%১৮%
যানজটের জন্য দায়ী মনে করেন৬২%৩৪%
চালকদের গড় ঋণের বোঝা৭৯,৯২৭ টাকা১৮,৬৫৪ টাকা
পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া চালক৭৫%

চালকদের আর্থ-সামাজিক দুরবস্থা

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, এই পেশায় আসা চালকদের বড় একটি অংশই নতুন। প্রায় ৭৫ শতাংশ চালকের আগে রিকশা চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের ফলে বেকারত্ব ঘোচাতে অনেক তরুণ এই বিপজ্জনক পেশায় ঝুঁকছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৭৯ শতাংশ চালক নিজেই এই রিকশার মালিক নন। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা সংসার চালাচ্ছেন; ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার টাকা, যা প্যাডেল রিকশা চালকদের তুলনায় অনেক বেশি।

সমাধান ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত

আলোচনা সভায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মো. সেলিম খান বলেন, কেবল রিকশাই নয়, ফুটপাত ও রাস্তার অবৈধ দখলও যানজটের জন্য সমানভাবে দায়ী। তিনি সিটি করপোরেশনকে রিকশা পার্কিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা ‘মার্কিং লাইন’ নির্ধারণের পরামর্শ দেন। বুয়েটের অধ্যাপক মো. মুসলেহ উদ্দিন হাসান যাতায়াত সমস্যা সমাধানে পাবলিক বাস সার্ভিসের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

পরিশেষে, বক্তারা ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি সুনির্দিষ্ট লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় আনা, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এলাকাভিত্তিক রিকশার সংখ্যা সীমাবদ্ধ করার পরামর্শ দেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, মালিক-শ্রমিক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে রাজধানীকে মুক্ত করতে।