দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন আইনকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, নতুন আইনের কিছু বিধান দুর্বল ও সংকটে থাকা ব্যাংকের পূর্ববর্তী মালিক বা শেয়ারধারীদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতে সুশাসনের পরিবর্তে অনিয়ম ও লুটপাটের সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, আইনটি প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলাপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে এতে এমন কিছু বিধান যুক্ত হয়েছে, যা অতীতের অনিয়ম ও ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের পথ খুলে দিতে পারে বলে সংস্থাটি মনে করছে। টিআইবির ভাষায়, এটি “দায়মুক্তির সংস্কৃতি”কে আরও শক্তিশালী করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংস্থাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করে, পূর্ববর্তী ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ স্পষ্টভাবে বলা ছিল যে ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অর্থ ফেরত দিলেও তাদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকবে না। তবে নতুন আইনে সংযোজিত ১৮(ক) ধারা সেই অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এর ফলে পূর্বে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নীতিগতভাবে উদ্বেগজনক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে ব্যাংক লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির পরিবর্তে পুরস্কৃত করার শামিল। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে এমন নীতি দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীকে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেবে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কোন মানদণ্ডে পূর্ববর্তী ব্যর্থ মালিকদের আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আনার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং বাস্তবে এসব শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নতুন আইনে মালিকানা পুনঃগ্রহণের জন্য যেসব আর্থিক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবে যথেষ্ট কঠোর নয় এবং এতে ঝুঁকি রয়ে গেছে। নিচে এ সংক্রান্ত প্রধান শর্তগুলোর একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| বিষয় | শর্ত/ব্যবস্থা |
|---|---|
| প্রাথমিক অর্থ প্রদান | মোট মূল্যের মাত্র ৭.৫ শতাংশ |
| অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ | ২ বছরের মধ্যে কিস্তিতে |
| সুদের হার | প্রায় ১০ শতাংশ |
| মালিকানা পুনঃপ্রাপ্তি | পূর্ব মালিকদের জন্য উন্মুক্ত |
| দায়মুক্তি সুবিধা | শর্তসাপেক্ষে প্রযোজ্য |
টিআইবি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, এই কাঠামো কার্যকর হলে পূর্বের ঋণখেলাপি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এতে ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার, মূলধন ঘাটতি এবং সামগ্রিক আর্থিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের মাধ্যমে সরকার ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল রাখার যে উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছে, তা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বরং এটি অতীতের অনিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশঙ্কা তৈরি করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ব্যাংক খাতে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা পুনর্বহাল করা হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কার কখনোই সফল হবে না। এতে ব্যাংকিং খাত আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে এবং এর বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে।
সব মিলিয়ে টিআইবির এই কঠোর অবস্থান ব্যাংক রেজুলেশন আইন নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনটি কার্যকর করার আগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, ঝুঁকি এবং সুশাসনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি, নচেৎ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
