অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ অবশেষে সংসদে পাস হয়ে স্থায়ী আইনে পরিণত হয়েছে। তবে নতুন আইনে একটি বিতর্কিত ধারা সংযোজন হওয়ায় অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল ও একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের পুনরায় মালিকানা ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়াকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক ঘনীভূত হয়েছে।
নতুন আইনের ১৮ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় আসা ব্যাংকের আগের শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি চাইলে পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে আবেদন করতে পারবেন। তবে এ জন্য নির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, আগের মালিকদের যেসব শর্ত পূরণ করতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা পরিশোধ, নতুন মূলধন সংযোজন, আমানতকারী ও পাওনাদারের সব দাবি নিষ্পত্তি এবং কর ও অন্যান্য সরকারি পাওনা পরিশোধ। পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারেরও অঙ্গীকার করতে হবে।
তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে অর্থ পরিশোধের কাঠামো। আইন অনুযায়ী, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ অর্থ ব্যাংক পুনর্গঠনে ব্যয় করেছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়েই প্রাথমিকভাবে মালিকানা ফিরে পাওয়ার আবেদন করা যাবে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইনের মূল আর্থিক কাঠামো
| বিষয় | শর্ত |
|---|---|
| প্রাথমিক অর্থ পরিশোধ | সরকারি সহায়তার ৭.৫ শতাংশ |
| বাকি অর্থ পরিশোধ | ২ বছরের মধ্যে |
| সুদের হার | ১০% সরল সুদ |
| পূর্ব শর্ত | সব দেনা ও দায় নিষ্পত্তি |
| অতিরিক্ত শর্ত | নতুন মূলধন ও আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন |
বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্ত শিথিল হওয়ায় অতীতে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ থাকা মালিকদের জন্য আবারও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে ফেরার পথ তৈরি হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, আবেদন মঞ্জুর হলে তিন মাসের মধ্যে নির্ধারিত অর্থ জমা দিয়ে আগের শেয়ার ও সম্পদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
অন্যদিকে, আইনটির বড় অংশ আগের অধ্যাদেশের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে গ্রহণ করা হয়েছে। এতে রয়েছে প্রশাসক নিয়োগ, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, ব্রিজ ব্যাংক গঠন, রেজল্যুশন তহবিল, সরকারি সহায়তা এবং প্রয়োজনে ব্যাংক অবসায়নের বিধান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই বিধানের ফলে আগের মালিকরা খুব সহজে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। যেহেতু মাত্র ৭.৫ শতাংশ অর্থ দিলেই প্রাথমিক মালিকানা পাওয়া যায়, ভবিষ্যতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেখানে কঠোর শর্ত প্রয়োজন ছিল, সেখানে তুলনামূলকভাবে নমনীয় কাঠামো রাখা হয়েছে, যা নৈতিক ঝুঁকি (moral hazard) বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এ কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ১৮ (ক) ধারা শুরুতে অধ্যাদেশে ছিল না বলে জানা গেছে। সংসদে বিল উত্থাপনের আগে শেষ মুহূর্তে এটি সংযোজন করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানালেও তা পরিবর্তন হয়নি।
এর আগে সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এসব ব্যাংকের মালিকানা পূর্বে বিভিন্ন বিতর্কিত গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন আইনের অধীনে বর্তমানে ব্যাংক খাতে পুনর্গঠন, রেজল্যুশন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। তবে বিতর্কিত মালিকানা পুনঃপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
