ব্যাংক ম্যানেজারের স্ত্রীর নামে অবৈধ সম্পদ, দুদকের মামলা

দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে বগুড়ায় এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে নাজিয়া জাহান (৪০) নামে এক গৃহবধূর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, অভিযুক্ত নাজিয়া জাহান যমুনা ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখার বরখাস্তকৃত সাবেক ব্যবস্থাপক সাওগাত আরমানের স্ত্রী। এই মামলাটি দেশের ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তাদের পারিবারিক অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রবণতার দিকে আবারও আঙুল তুলেছে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অনুসন্ধানের বিবরণ

অভিযুক্ত নাজিয়া জাহানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট নাজিয়া জাহান বগুড়া জেলা কার্যালয়ে তার সম্পদের একটি বিবরণী জমা দেন। তবে সেই বিবরণী যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে প্রকৃত সম্পদের বিশাল ফারাক। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে দুদক জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক রোকনুজ্জামান এই মামলা এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের ফলাফল গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাজিয়া জাহান কেবল সম্পদ গোপনই করেননি, বরং আয়ের কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিচে তার অর্জিত সম্পদ এবং আয়ের হিসাবের একটি তুলনামূলক ছক তুলে ধরা হলো:

সম্পদের বিবরণপরিমাণ (টাকায়)
স্থাবর সম্পদ (জমি ও বাড়ি)৩৬,৩৪,৮০০
অস্থাবর সম্পদ (নগদ ও অন্যান্য)৭৩,৫৬,৪৬১
মোট অর্জিত নিট সম্পদ১,০৯,৯১,২৬১
পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়৫,৭০,০০০
ব্যয়সহ সর্বমোট সম্পদ১,১৫,৬১,২৬১
বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়৩৭,৪৩,১২৪
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ৭৮,১৮,১৩৭

আইনি অপরাধ ও সম্পদ গোপন করার ধরণ

নাজিয়া জাহান তার সম্পদ বিবরণীতে ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৬১ টাকার সম্পদের তথ্য সুকৌশলে গোপন করেছিলেন। এটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, তিনি সম্পদের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ ঋণের দাবি করলেও তার স্বপক্ষে কোনো ব্যাংকিং নথিপত্র বা বৈধ রেকর্ড দেখাতে পারেননি। ফলে তার দাবি করা ঋণগুলো দুদক নাকচ করে দেয় এবং তার পূর্ণ নিট সম্পদকে অবৈধ অর্জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নাজিয়া জাহানের কাছে ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ১৩৭ টাকা মূল্যমানের এমন সম্পদ পাওয়া গেছে যার কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। এটি দুদক আইনের ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে।

পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ

দুদক বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক রোকনুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রধান কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই এই মামলাটি রুজু করা হয়েছে। বর্তমানে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করা হবে এবং এরপরই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। ব্যাংকিং খাতের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য হয়ে কীভাবে একজন গৃহবধূ এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হলেন, তার নেপথ্যে অন্য কারও ইন্ধন বা অর্থপাচারের যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছে দুদক।