ব্যাংক খাতে ঋণের ডিফল্ট হার বৃদ্ধি

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণের ডিফল্টের হার গত এক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক “ব্যাংকিং আপডেট” প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকের শেষে ডিফল্টের হার ৩১.২০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ১৯.৯০ শতাংশের তুলনায় ১২.৩ শতাংশ বেশি।

টাকার পরিমাণে, ৩১.২০ শতাংশের ডিফল্ট হার প্রায় ৫,৫৪,৪৮৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিবিন্যাস প্রবর্তনের ফলে এই বৃদ্ধি প্রধানত ঘটেছে। ২০২৫ সালের পর থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে না পরিশোধ হওয়া ঋণকে ডিফল্ট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পূর্বে এই সময়সীমা ছিল ১৮০ দিন।

একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৯০ দিনের নতুন নিয়মের কারণে নন-পারফর্মিং ঋণের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি সহায়তার ফলে ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি পদক্ষেপ হলো ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ দ্রুত বাতিল করার ব্যবস্থা। আগে এই ঋণ দুই বছর পরিশোধ না হলে মাত্র বাদ দেওয়া যেত। নতুন নিয়মে, দ্রুত বাতিল সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষে ডিফল্টের হার ছিল ৩৬.৩০ শতাংশ। শীর্ষ কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার মাধ্যমে তাদের ডিফল্ট ঋণ পুনর্গঠন করেছে। ফলে অনেক ঋণ ডিফল্ট তালিকা থেকে সরানো হয়েছে; না হলে ডিসেম্বরের সংখ্যা আরও বেশি হতো।

ব্যাংকারদের মতে, গত এক বছর-আধাবছরে ঋণ ডিফল্ট বৃদ্ধির মূল কারণ হলো আগে লুকানো খারাপ ঋণ প্রকাশ পায়। আগে যেসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো অথচ পরিশোধ হতো না, তা এখন আর সম্ভব নয়। বিদেশি অডিট প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পর্যালোচনা করেছে। বিশেষ করে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর ডিফল্ট ঋণের সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দীর্ঘ সময়ের ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির প্রভাব এই পরিস্থিতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপ এবং BASIC ব্যাংক সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিগুলো ঋণ ডিফল্ট বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।

নীচের টেবিলটি প্রধান ব্যাংকগুলোর ডিফল্ট ঋণের সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরেছে:

ব্যাংকের ধরনসেপ্টেম্বর ২০২৫ডিসেম্বর ২০২৫পরিবর্তন (%)
ইসলামী ব্যাংক৪০.৫%৩৫.২%-৫.৩%
সাধারণ ব্যাংক৩২.০%৩১.৮%-০.২%
মোট৩৬.৩%৩১.২%-৫.১%

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে, তবে কিছু সাধারণ ব্যাংকও বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ডিফল্ট হার কমানো কঠিন।