গত সপ্তাহে দেশের পুঁজিবাজারে এক ধরনের মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। সপ্তাহের শুরুতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করলেও শেষদিকে ব্যাংক খাতের ইতিবাচক পারফরম্যান্স বাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। ফলে সার্বিকভাবে বড় ধরনের পতন এড়াতে সক্ষম হয়েছে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫,২৫৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ০.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। একই সময়ে ডিএস-৩০ সূচক ২২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২,০০২ পয়েন্টে পৌঁছেছে। শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএসও সামান্য বাড়তি গতি পেয়ে ১,০৬৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
ডিএসই সূচকের সাপ্তাহিক পরিবর্তন:
| সূচক | আগের সপ্তাহ | গত সপ্তাহ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ডিএসইএক্স | ৫,২২০ | ৫,২৫৮ | +৩৮ পয়েন্ট |
| ডিএস-৩০ | ১,৯৮০ | ২,০০২ | +২২ পয়েন্ট |
| ডিএসইএস | ১,০৫৯ | ১,০৬৩ | +৪ পয়েন্ট |
যদিও সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তবুও বাজারের সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি ইতিবাচক ছিল না। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৭টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৩৮টির, কমেছে ২২০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৯টির। এতে বোঝা যায়, বাজারে বিক্রির চাপ বিদ্যমান থাকলেও কিছু বড় মূলধনী ও প্রভাবশালী শেয়ারের উত্থান সূচককে ইতিবাচক রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ব্যাংক খাতের কয়েকটি শেয়ার—যেমন ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক—সূচক বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এর পাশাপাশি তাওফিকা ফুড অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ারের উত্থানও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংক খাতে সম্ভাব্য লভ্যাংশ ঘোষণার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে, যা এই খাতকে পুনরায় সক্রিয় করে তুলেছে।
লেনদেনের পরিমাণেও সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। গত সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৬৬৯ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের ৬৬৮ কোটি টাকার তুলনায় ০.২০ শতাংশ বেশি। যদিও এই বৃদ্ধি সীমিত, তবুও এটি বাজারে আস্থার ধীরে ধীরে ফিরে আসার একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওষুধ ও রসায়ন খাত লেনদেনে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যা মোট লেনদেনের ১৫.৮ শতাংশ দখল করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রকৌশল খাত (১৪.২ শতাংশ), এরপর ব্যাংক খাত (৯.৩ শতাংশ), বস্ত্র খাত (৯ শতাংশ) এবং সাধারণ বীমা খাত (৮.৮ শতাংশ)।
খাতভিত্তিক লেনদেনের হার:
| খাত | লেনদেনের অংশ (%) |
|---|---|
| ওষুধ ও রসায়ন | ১৫.৮% |
| প্রকৌশল | ১৪.২% |
| ব্যাংক | ৯.৩% |
| বস্ত্র | ৯.০% |
| সাধারণ বীমা | ৮.৮% |
রিটার্ন বিশ্লেষণে চামড়া খাত সর্বোচ্চ ২.৪ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এছাড়া ব্যাংক ও কাগজ-মুদ্রণ খাতে ১.৭ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১.৪ শতাংশ এবং সিমেন্ট খাতে ১.৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। বিপরীতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ২.৯ শতাংশ, জীবন বীমা খাতে ২.৮ শতাংশ এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে ১.৮ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন রেকর্ড হয়েছে।
সপ্তাহের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দেশের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যার ফলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে। তবে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধবিরতির খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসে। যদিও শেষ কার্যদিবসে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা আবারও সূচকে সামান্য পতন ঘটায়।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)–তেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সিএএসপিআই সূচক ০.৪৯ শতাংশ বেড়ে ১৪,৭৭৪ পয়েন্টে এবং সিএসসিএক্স সূচক ০.৬৩ শতাংশ বেড়ে ৯,০৩৯ পয়েন্টে পৌঁছেছে। লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের সপ্তাহের ১৮৮ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি।
সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৯৭টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ১২৩টির দর বেড়েছে, ১৪৪টির কমেছে এবং ৩০টির অপরিবর্তিত ছিল—যা বাজারে মিশ্র প্রবণতারই প্রতিফলন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ব্যাংক খাতের ইতিবাচক প্রবণতা পুঁজিবাজারকে একটি বড় পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে আগামী সপ্তাহগুলোতে বাজারের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে এসব বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ প্রভাবকের ওপর—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
