ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নারী কর্মী কমেছে ৭৭০

দেশের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সাম্প্রতিক ছয় মাসে নারী কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকে নারী কর্মী ৭২১ জন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪৯ জন কমে মোট ৭৭০ জনের হ্রাস দেখা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬১ জন, যেখানে জুনে সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার ৭৮২। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে ১ হাজার ১৯ জনে নেমেছে, জুনে যেখানে ছিল ১ হাজার ৬৮।

নারী–পুরুষ কর্মী সংখ্যা (২০২৫)

খাতজুন নারী কর্মীডিসেম্বর নারী কর্মীপরিবর্তন
ব্যাংক৩৫,৭৮২৩৫,০৬১-৭২১
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান১,৬৮১,১৯-৪৯
মোট৩৫,৯৫০৩৬,০৮০-৭৭০

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট ২ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৭ জন কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ কর্মী ১ লাখ ৮২ হাজার ৪০৭ এবং নারী কর্মী ৩৬,০৮০। অর্থাৎ মোট কর্মীর মধ্যে নারী ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পুরুষ ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

ব্যাংক খাত–বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংকটে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত বা বন্ধ হওয়ার কারণে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে। সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে নেওয়া এই পদক্ষেপে অনেক নারী চাকরি ছেড়েছেন। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে নারীরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

অনিতা গাজী রহমান, পরিচালক, ব্র্যাক ব্যাংক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বলেন, “শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা প্রায়শই পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে থাকেন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এসে সেই সুবিধা বদলে যায়। পরিবার, সন্তান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে নারী কর্মী অনেক সময় কর্মজীবন থেকে সরে যান। এটি প্রতিরোধ করতে সমাজ, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে আরও নারীবান্ধব হতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।”

ব্যাংকভিত্তিক নারী কর্মী বিতরণ

ব্যাংক ধরননারী কর্মী সংখ্যামোট কর্মীর মধ্যে অংশ (%)
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক২২,৯৮৩১৬%
রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক৯,১৪৭১৮%
বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংক১,৯৪৭১৭%
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক৯৮৪২৫%

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংকে নারী কর্মীদের মধ্যে সর্বাধিক প্রাথমিক পর্যায়ে (১৭% বেশি) কর্মরত, মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং উচ্চপর্যায়ে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারী কর্মীর হার সর্বনিম্ন ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সংখ্যার ভিত্তিতে বেসরকারি ব্যাংকে নারী কর্মী বেশি হলেও উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত।

২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট কর্মী বেড়েছে ২৯ হাজার, যার মধ্যে পুরুষ বেড়েছে ২২,৩১৬ জন এবং নারী ৬,৬৮৭ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে নারী কর্মীর সংখ্যা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ছয় মাসের পরিসরে হ্রাসের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, শুধু ব্যাংক নয়, সব ধরনের কর্মক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের কারণে নারী কর্মী এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তাই নারী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন অপরিহার্য।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ছয় মাসে সাত শতাধিক নারী কর্মীর হ্রাস কেবল সংখ্যাগত নয়, এটি নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জকেও প্রতিফলিত করছে।