ব্যাংক আলফালাহ অধিগ্রহণে ব্যাংক এশিয়ার বিশেষ সাধারণ সভা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক বড় ধরনের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের (M&A) প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে। পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ অংশের যাবতীয় সম্পদ ও দায় অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা অনুমোদনের লক্ষ্যে বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক এশিয়া পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তার এবং বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে এই কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ইজিএম ও রেকর্ড তারিখের সময়সূচি

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়েছে যে, গত ২৯ জানুয়ারি ব্যাংক এশিয়ার পরিচালনা পর্ষদ এই অধিগ্রহণ প্রস্তাবের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এখন শেয়ারহোল্ডারদের চূড়ান্ত সম্মতির জন্য আগামী ১২ এপ্রিল সকাল ১১টায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ১৩তম ইজিএম অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ ফেব্রুয়ারি।

ব্যাংক আলফালাহ অধিগ্রহণের প্রেক্ষাপট ও আর্থিক মূল্যায়ন

ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ কার্যক্রম কিনে নিতে গত বছরের ২৮ মে দুই ব্যাংকের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। এর আগে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিষয়ে নীতিগত সবুজ সংকেত দেয়। ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থা, সম্পদ ও দায় মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (PwC) বাংলাদেশ-সহ আরও দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে এই অধিগ্রহণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

ব্যাংক দুটির বর্তমান অবস্থান ও এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানব্যাংক এশিয়া পিএলসি (বাংলাদেশি ব্যাংক)
অধিগ্রহণকৃত প্রতিষ্ঠানব্যাংক আলফালাহ (পাকিস্তানভিত্তিক ব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যক্রম)
সমঝোতা স্মারক সই২৮ মে, ২০২৪
সম্ভাব্য ব্যয়প্রায় ৬০০ কোটি টাকা
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানপিডব্লিউসি (PwC) বাংলাদেশ ও অন্যান্য
মূল উদ্দেশ্যইসলামি ব্যাংকিং সেবার প্রসার ও বাজার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি

ব্যাংক এশিয়ার বিদেশি ব্যাংক অধিগ্রহণের ইতিহাস

১৯৯৯ সালে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংক এশিয়া বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের ব্যবসা কিনে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ অভিজ্ঞ। এটি তাদের তৃতীয়বারের মতো কোনো বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম অধিগ্রহণের উদ্যোগ। ব্যাংকটির এই পথচলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিম্নরূপ:

১. নোভা স্কোটিয়া: কানাডাভিত্তিক এই ব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংক এশিয়া তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করে।

২. মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক (MCB): পাকিস্তানের এই ব্যাংকটির বাংলাদেশ অংশের ব্যবসা কিনে নিয়ে নিজেদের পোর্টফোলিও বড় করে ব্যাংক এশিয়া।

৩. ব্যাংক আলফালাহ: বর্তমান উদ্যোগটি সফল হলে এটি হবে ব্যাংক এশিয়ার তৃতীয় বড় আন্তর্জাতিক অধিগ্রহণ।

কৌশলগত গুরুত্ব ও বাজার প্রভাব

ব্যাংক আলফালাহর বর্তমান কার্যক্রম মূলত ইসলামি ব্যাংকিং ধারায় বেশ শক্তিশালী। ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলফালাহকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে তারা দেশের প্রচলিত (Conventional) ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় শীর্ষস্থান দখল করতে চান। উল্লেখ্য যে, এর আগে শ্রীলঙ্কার হাটন ন্যাশনাল ব্যাংক আলফালাহর বাংলাদেশ শাখা কেনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল এবং নিরীক্ষার অনুমতিও পেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পিছিয়ে যাওয়ায় ব্যাংক এশিয়ার জন্য এই সুযোগ তৈরি হয়।

এই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে ব্যাংক এশিয়ার আমানত ও ঋণের ভিত্তি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি গ্রাহক সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।