ব্যাংকের আমানত ফেরত প্রশ্নে কঠোর বার্তা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবং একাধিক ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, কোনো দুর্বল বা সংকটাপন্ন ব্যাংকের আমানত ফেরতের দায় তারা সরাসরি নেবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে হবে।

বুধবার ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের অন্তত ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। এই চিত্র দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এ অবস্থায় কোনো ব্যাংককে অধিগ্রহণ কিংবা জাতীয়করণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে পরিষ্কার করে জানান তিনি। বরং প্রচলিত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই ব্যাংকগুলোকে তাদের দায়বদ্ধতা পালনে বাধ্য করা হবে। আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংক যদি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা দেবে এবং নিয়ন্ত্রক ও তদারকির ভূমিকা পালন করবে। তবে সরাসরি আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না—এই বার্তাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ব্যাংক খাতের এই চাপের মধ্যেও দেশের অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে ১৭০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ১৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ে দৃশ্যমান বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২০ কোটি ডলার, যা রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা নির্দেশ করে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৪৭৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এই অঙ্ক আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।

সাম্প্রতিক মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র নিচে দেওয়া হলো—

মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহ (মার্কিন ডলার)

মাস | রেমিট্যান্সের পরিমাণ
জুলাই | ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ
আগস্ট | ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার
সেপ্টেম্বর | ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার
অক্টোবর | ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার
নভেম্বর | ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, হুন্ডি দমনে কঠোর নজরদারি এবং প্রবাসীদের জন্য দেওয়া প্রণোদনার সুফল মিলেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।